ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এই প্রবন্ধে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন বাংলার নবজাগরণ, সমাজসংস্কার ও শিক্ষার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন কেবল সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি সংগ্রাম, ত্যাগ ও অসীম মানসিক যন্ত্রণার এক অনন্য ইতিহাস। বাংলার সমাজসংস্কার, নারীশিক্ষা এবং বিধবা বিবাহ আন্দোলনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য হলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি চরম আঘাত, বিরোধিতা ও নিঃসঙ্গতার শিকার হয়েছিলেন। মূল লেখাটি ওয়েবসাইটে প্রকাশের প্রয়োজনে কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর কে ছিলেন?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন উনিশ শতকের বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিদ্যাসাগর ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার একজন প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ, মানবতাবাদী ও চিন্তাবিদ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন আমাদের শিক্ষা, মানবতা ও সমাজসংস্কারের এক অনন্য উদাহরণ। Ishwar Chandra Vidyasagar biography in Bengali এই প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
১. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন: প্রারম্ভিক পর্যায়
মহাকালের জয়মাল্য গলায় পরতে হলে সমকালের বহু নির্যাতন ভোগ করতে হয়— একথা পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০—১৮৯১ খ্রি.) তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন। আজীবন সংগ্রামী বিদ্যাসাগর বাংলার সামাজিক অগ্রগতি, শিক্ষার অগ্রগতি, নারীকল্যাণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে অসামান্য অবদান রেখেছেন তা তাঁকে প্রতিটি বাঙালির জীবনে প্রাতঃস্মরণীয় করে রেখেছে। আপসহীন বিদ্যাসাগর বাংলার নারীমুক্তির অগ্রদূত।

বিদ্যাসাগরের সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান
- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান। নিজ অর্থব্যয়ে বাংলার বিভিন্ন স্থানে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বিদ্যাসাগর শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটান। প্রতিটি বাঙালি পরিবারে সুলভ ‘বর্ণপরিচয়’ পৌঁছে দিয়ে তিনি বাংলাভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার পথ সুগম করেন। তিনি অন্যান্য গ্রন্থ রচনার মধ্য দিয়ে পুরোনো বাংলা ভাষারীতিকে পালটে দেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে বাংলাভাষাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
- বাল্য বিধবাদের দুঃখে কাতর বিদ্যাসাগর তাদের জন্য প্রাণপাত করেন। তিনি আজীবন দরিদ্রদের অকাতরে দান করেছেন। তাঁর মহানুভবতার প্রশংসা করে সমকালীন ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা লিখেছিল— “শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গুণ আমরা জীবন সত্ত্বেও ভুলিতে পরিব না। তাঁহার অদ্বিতীয় নাম এই অসাধারণ কীর্তির সহিত মহীতলে চিরকাল জীবিত থাকিবে।”
সমকালীন সমাজের বিরোধিতা ও সমালোচনা
সমকালীন সমাজের অগ্রগতিতে যাঁর এরূপ সুমহান ভূমিকা, সেই বিদ্যাসাগরই আবার তাঁর স্ত্রী-পুত্র, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমকালীন শিক্ষিত সমাজ, কলকাতাবর বাবু সম্প্রদায়, ইংরেজ শাসকশ্রেণি, বাঙালি জমিদারশ্রেণি, এমনকি তাঁর নিজের মা-বাবা— সবার কাছ থেকেই আঘাত পেয়ে জর্জরিত হয়েছেন।1 এমনকি নব্য পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, নবগোপাল মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ সমকালীন প্রগতিশীল মানুষও বিদ্যাসাগরকে নিন্দামন্দ করতে ছাড়েননি। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে সূর্যমুখীর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, “যে বিধবার বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পণ্ডিত তবে মুর্খ কে?”
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তাঁর জীবন ও বন্দে মাতরম্ বিষয়ক আলোচনা দেখুন। 👇👇
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ও বন্দে মাতরম্ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা
২. বিদ্যাসাগরের জীবনের নৈরাশ্য ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের সূচনা
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সত্তর বছরের জীবনের প্রথম আটত্রিশ বছরকে (১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) অগ্রগমনের যুগ বলে চিহ্নিত করা যায়। তাঁর জীবনের শেষ বত্রিশ বছর একের পর এক মর্মভেদী ঘটনা ঘটেছে। বন্ধুবিচ্ছেদ, বন্ধুমৃত্যু, আত্মীয়-বিচ্ছেদ, নিজ কন্যাদের বৈধব্য, আর্থিক সংকট, বাবামায়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ প্রভৃতি ঘটনা বিদ্যাসাগরকে মানসিক যন্ত্রণার যাঁতাকলে পিষে দিয়েছে।2
পারিবারিক সমস্যা ও পুত্র নারায়ণচন্দ্রের শিক্ষা সংকট
- ঈশ্বরচন্দ্রের দুই ভাই হরচন্দ্র ও হরিশচন্দ্র দুই বছরের মধ্যে কলকাতায় কলেরা রোগে মারা যান। তাই বিদ্যাসাগরের পিতা ঠাকুরদাস পৌত্র নারায়ণচন্দ্রকে বীরসিংহ থেকে কলকাতায় পাঠাতে দিলেন না। বিদ্যাসাগর অনেক চেষ্টা করেও নারায়ণচন্দ্রকে কলকাতায় আনার বিষয়ে বাবাকে রাজি করাতে পারলেন না। ফলে ষোলো বছর বয়সেও নারায়ণচন্দ্র গ্রামের পাঠশালাতেই আটকে থাকলেন, পাঠশালার শিক্ষা অতিক্রম করে উচ্চশিক্ষায় পা রাখতে পারলেন না। বিদ্যাসাগর লক্ষ্য করলেন যে, পিতামহের অন্ধ স্নেহ ও প্রশ্রয়ে নারায়ণ গোল্লায় যাচ্ছে। এজন্য তিনি বাবা ঠাকুরদাসের প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে একদা তাঁকে বলেন যে, ‘‘আপনি ঈশান ও নারায়ণের মাথা খাইতেছেন, তথাপি আপনি লোকের নিকট কিরূপে আপনাকে নিরামিষাশী বলিয়া পরিচয় দেন?’’
- এরপর বিদ্যাসাগর একপ্রকার জোর করে নারায়ণচন্দ্রকে কলকাতায় এনে সংস্কৃত কলেজের বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। কিন্তু নারায়ণ সেখানে মাত্র কয়েকমাস পড়ে এখান থেকে পালিয়ে গ্রামে ফিরে যান।3 বিদ্যাসাগরের মতো এমন মহান পিতার পুত্র হিসেবে নারায়ণচন্দ্র সম্পর্কে শ্রীগিরিজাচরণ ঘোষ লিখেছেন, “যোগ্য পিতার উপযুক্ত মর্যাদাসম্পন্ন পুত্রের আবির্ভাব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে এ কথাও মনে রাখতে হযে, বিদ্যাসাগর হলেন যুগমানব। তাঁর মতো নির্ভীক তেজস্বী সর্বগুণসম্পন্ন পুরুষ পৃথিবীতে যুগে যুগে জন্মগ্রহণ করেন না। কাজেই তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্র পিতার উপযুক্ত মর্যাদাসম্পন্ন সন্তান হতে পারেননি, একথা চিন্তা করে বিলাপ করার কোন কারণই থাকতে পারেনা।” 4

কর্মজীবনের পরিবর্তন ও পদত্যাগ (১৮৫৮)
১৮৫৮ সালে বিদ্যাসাগরের বয়স তখন আটত্রিশ বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি সরকারের উচ্চপদে বসে বাংলার শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের কাজে নিজেকে সমর্পণ করেন। এই কাজে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে সরকারি সহায়তাকেও কাজে লাগাতে চান। কিন্তু এই সময়ই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতান্তরের ফলে তিনি ১৮৫৮ সালের নভেম্বরে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মূলত এই সময় থেকেই প্রভাব-প্রতিপত্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের সিংহাসন থেকে নেমে এসে বিপুল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে তাঁকে বাস্তবের কন্টকাকীর্ণ পথে অগ্রসর হতে হয়। এখান থেকেই বিদ্যাসাগরের জীবনের নৈরাশ্যের সূত্রপাত বলা যায়।5
৩. বিদ্যাসাগরের অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও মানসিক আঘাত
এদিকে বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ইতিপূর্বেই বিদ্যাসাগরের মতান্তর শুরু হয়েছিল। ইতিমধ্যে সীমাহীন দানধ্যানে বিদ্যাসাগর নানা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছেন।
বিধবাবিবাহ ও দানকার্যে আর্থিক সংকট
- বিদ্যাসাগর নিজ অর্থে একের পর এক বিধবাবিবাহ দিতে গিয়ে নিজের প্রচুর অর্থব্যয় করেন। তখনও পর্যন্ত ষাট জন বিধবার বিয়েতে প্রায় বিরাশি হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। এদিকে বীরসিংহ ও বর্ধমানের দুর্ভিক্ষে ত্রাণকার্য চালিয়েও প্রচুর অর্থব্যয় করেন। এভাবে বিদ্যাসাগর বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন এবং কিছুদিনের মধ্যে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। এই ঋণ থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে সংস্কৃত মুদ্রণযন্ত্র নামে নিজের প্রতিষ্ঠিত প্রেসের বৃহদংশ তিনি বিক্রি করে দেন।6
- এই পরিস্থিতিতে অভিমানী বিদ্যাসাগর তাঁর পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখেন— “সংসার বিষয়ে আমার মত হতভাগ্য আর দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে যত্ন করিয়াছি। কিন্তু অবশেষে বুঝিতে পারিয়াছি, সে বিষয়ে কোন অংশে কৃতকার্য্য হইতে পারি নাই। যে সকলকে সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টা পায়, সে কাহাকেও সন্তুষ্ট করিতে পারে না।”7 বিদ্যাসাগর অন্য একটি চিঠিতে পিতা ঠাকুরদাসকে লেখেন— “কার্যগতিকে ঋণে বিলক্ষণ আবদ্ধ হইয়াছি। ঋণ পরিশোধ না হইলে, লোকালয় পরিত্যাগ করিতে পারিতেছি না। এক্ষণে যাহাতে সত্বর ঋণ মুক্ত হই, তদ্বিষয়ে যথোচিত যত্ন ও পরিশ্রম করিতেছি। ঋণে নিষ্কৃতি পাইলেই কোনো নির্জন স্থানে গিয়া অবস্থিতি করিব।”8
❌ বিদ্যাসাগরের আগে
- বিধবা বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
- নারীশিক্ষা প্রায় অনুপস্থিত
- সমাজে কুসংস্কারের প্রভাব বেশি
- শিক্ষা সীমিত ছিল উচ্চবিত্তের মধ্যে
- বাংলা গদ্য জটিল ও দুর্বোধ্য
✅ বিদ্যাসাগরের পরে
- বিদ্যাসাগরের সহায়তায় ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাশ
- নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসার
- সমাজে যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদ বৃদ্ধি
- শিক্ষা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়
- সহজ ও প্রাঞ্জল বাংলা গদ্যের প্রচলন
পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব ও কাশীবাস
যাই হোক, পিতা-পুত্রের এই মতান্তরের চূড়ান্ত পরিণতিতে ঠাকুরদাস ১৮৬৫ সালে বীরসিংহ ছেড়ে কাশীবাসের সিদ্ধান্ত নেন। পিতা ঠাকুরদাস পৌত্র নারায়ণচন্দ্রকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাই পিতার কাশীবাসের সঙ্কল্প পরিত্যাগ করানোর উদ্দেশ্যে বিদ্যাসাগর নারায়ণচন্দ্রকে কাজে লাগালেন। নারায়ণচন্দ্র পিতামহের কাছে গিয়ে অনেক কান্নাকাটি এবং তাঁর সঙ্গে কাশী যাওয়ার আবদার করলো। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হল না। ঠাকুরদাস যথারীতি কাশী-যাত্রা করলেন।9 ফলে এখন থেকে বিদ্যাসাগরই বাড়ির কর্তা।
ব্যক্তিগত শোক: প্রভাবতীর মৃত্যু
বিদ্যাসাগর কলকাতায় তাঁর বন্ধু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌত্রী প্রভাবতীকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। কিন্তু ১৮৬৫ সালেই মাত্র তিন বছর বয়সে সে-ও মারা যায়। তাঁর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বিদ্যাসাগর লেখেন, “বোধ হয় যদি এই নৃশংস নরলোকে অধিকদিন থাক, উত্তরকালে অশেষ যন্ত্রণা ভোগ অপরিহার্য, ইহা নিশ্চিত বুঝিতে পারিয়াছিল।”10
মনমোহিনীর বিয়ে ও মানসিক আঘাত
এরপর ১৮৬৯ সালের বর্ষাকালের ঘটনা। হালদারদের ধর্মপুত্র মুচীরাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনমোহিনীর বিয়ের খবর পেয়ে বীরসিংহ গ্রামে এলেন বিদ্যাসাগর। এদিকে হালদারেরা দল বেঁধে বিদ্যাসাগরের কাছে এসে অনুরোধ করলেন যাতে এই বিয়ে না হয়। বিদ্যাসাগরও এ বিয়ে না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মনমোহিনী ও তাঁর মা’কে নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেতে বললেন। সারারাত বৃষ্টি চলছে। শেষ রাতে বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে শাঁখের আওয়াজে ঈশ্বরচন্দ্রের ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভেঙে তিনি জানতে পারলেন— তাঁকে না জানিয়েই তাঁর ভাই দীনবন্ধু ও পুত্র নারায়ণের উদ্যোগে মুচীরাম-মনমোহিনীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এতে মা ভগবতী দেবী এবং স্ত্রী দীনময়ীরও পূর্ণ সমর্থন ছিল। নিজের কাছের মানুষেরা এভাবে তাঁকে গুরুত্বহীন করায় ঈশ্বরচন্দ্র খুবই মানসিক আঘাত পেলেন। তিনি সেই রাতে অন্নগ্রহণও করেননি।

গ্রামত্যাগ ও নিঃসঙ্গতার শুরু
সকালে বিদ্যাসাগর সবাইকে ডেকে বললেন, ‘‘আমি আমার কথা রাখতে পারলাম না। লোকের কাছে অপদস্থ হলাম। গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আর কখনও এ গ্রামে ফিরবো না।’’ তাঁর ভাই শম্ভুচন্দ্রের ভাষায়, “পরদিন প্রাতঃকালে অনাহারে ক্ষুব্ধ চিত্তে প্রিয় জন্মভূমি, সাধের বাড়িঘর চিরদিনের জন্য ত্যাগ করিয়া কলিকাতা যাত্রা করিলেন।”11 মা, স্ত্রী-পুত্র, নিজের হাতে গড়ে তোলা স্কুল, নিজের গ্রাম— সব কিছু পিছনে ফেলে চলে এলেন কলকাতায়। এর পরেও তিনি বাইশ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু কোনোদিন আর গ্রামে ফিরে যাননি।
৪. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও সম্পর্কচ্ছেদ
১৮৫৮ সালের পর বিদ্যাসাগরের জীবনের শেষ বত্রিশ বছরের প্রধান সাফল্য বলতে দুটি ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এক. কলকাতায় মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশনের প্রতিষ্ঠা এবং দুই. পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে জনৈক বিধবার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বিধবা বিবাহের অনন্য নজির গড়া।
মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন প্রতিষ্ঠা
বাংলায় আধুনিক শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে বিদ্যাসাগর ১৮৭২ সালে কলকাতায় মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতে সম্পূর্ণ বেসরকারি পরিচালনায় এটিই প্রথম ডিগ্রি কলেজ। এই কলেজ ১৮৭৯ সালে বিএ পড়ানোর অনুমতি পেয়ে তা একটি প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়। আর নিজপুত্রের বিয়েও দেন সচক্ষে বাল্যবিধবাদের দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে।
বিধবাবিবাহ প্রচলন
তিনি বিধবা বিবাহের প্রচলনের উদ্যোগ নিয়ে সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের বিরোধের মুখোমুখি হন। তা সত্ত্বেও বিধবাবিবাহ প্রচলনের বিষয়ে তিনি অনড় থাকেন। বাইরে থেকে নয়, নিজের পরিবারেই এই প্রথার প্রচলন করে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপনের উদ্যোগ নেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৭০ সালের ১১ আগস্ট নিজের স্ত্রী, মা, সমস্ত পরিবার-পরিজনের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে ষোলো বছর বয়সের বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীর বিয়ে দেন।
সামাজিক বিরোধিতা
নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে ভবসুন্দরীর বিয়ে সম্পন্ন হয় কলকাতার মির্জাপুর স্ট্রিটের কালীচরণ ঘোষের বাড়িতে। বিদ্যাসাগরের স্ত্রী, মা— কেউই এই বিয়ে সমর্থন করেননি এবং বিয়েতেও আসেননি। তারানাথ তর্কবাচষ্পতির স্ত্রী নববধূকে বরণ করেন। বিধবাবিবাহের প্রচলন করতে গিয়ে বিদ্যাসাগরকে কম ঝঞ্ঝাট সইতে হয়নি। নিজ পরিবার, নিজ গ্রাম, নিজ সমাজ— প্রায় সকলের কাছে বিদ্যাসাগর সমালোচনার পাত্রে পরিণত হন। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাঁর নামে নিন্দা ও অশ্লীল কুৎসা করতে থাকে। নিন্দুকেরা তাঁর সংস্কার-কার্যের পেছনে তাঁর নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির অভিসন্ধি দেখতে পেয়েছেন। অনেকে তাঁকে শারীরিক আক্রমণ ও ভীতি প্রদর্শনের দ্বারা সংস্কার-কার্য থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এবিষয়ে বিদ্যাসাগর নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, “আমাকে লোকেরা এতদূর নীচ কথা পর্যন্ত বলিয়া সময়ে সময়ে গালি দিয়াছে যে, আমি চরিত্রহীন বলিয়া অল্পবয়স্কা বিধবাদিগকে বাড়িতে আশ্রয় দেই।”12

চিঠিতে সামাজিক বিরোধিতার উল্লেখ
বিধবাবিবাহকে কেন্দ্র করে সমকালীন সমাজে বিদ্যাসাগর কতটা বিরম্বনা অনুভব করেছেন তার আভাস পাওয়া যায় বন্ধু দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে (সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতা) লেখা চিঠি থেকে। এই চিঠিতে তিনি লেখেন— “আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে, আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না। তৎকালে সকলে যেরূপ উৎসাহ প্রদান করিয়াছিলেন তাহাতেই আমি সাহস করিয়া এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম নতুবা বিবাহ ও আইন প্রচার পর্যন্ত করিয়া ক্ষান্ত থাকিতাম।”13 বিদ্যাসাগর তাঁর নানা সুখ-দুঃখের কথা পরম সুহৃদ বন্ধু দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলে নিজের মনের ভার একটু হালকা করতেন। কিন্তু প্রাণের বন্ধু দুর্গাচরণও ১৮৭০ সালে মারা যান।14
পুত্রের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ
নিজপুত্র নারায়ণচন্দ্রকে বিয়ে দিয়ে বিদ্যাসাগর যে বিধবাবিবাহের ক্ষেত্রে যে অনন্য নজির গড়েন, নিয়তির পরিহাস এমনই যে, পুত্রের বিবাহের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই পিতাপুত্রের সম্পর্কে ছেদ ঘটে। পুত্র নারায়ণচন্দ্রের উশৃঙ্খল ও অবাধ্য জীবনযাত্রা বিদ্যাসাগরকে চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাঁকে সুপথে আনার নানা চেষ্টা করেও বিদ্যাসাগর ব্যর্থ হন। এই পরিস্থিতিতে ১৮৭২ সালে তিনি পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে সমস্ত রকম সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ঘোষণা করেন। এরপর ১৮৭৪ সালে তিনি নির্দেশ দেন যে, নারায়ণ যেন তাঁর বাড়িতে প্রবেশ না করেন।
মাতা ও স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি
এদিকে নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে বিধবার বিবাহ ও অন্যান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে মা ভগবতী দেবীর সঙ্গেও বিদ্যাসাগরের সম্পর্কের অবনতি হয়। একদা মায়ের প্রতি অনেক অভিমানে বিদ্যাসাগর মাকে চিঠিতে লেখেন— “আর এক মুহূর্তের জন্য আমি কোনও পারিবারিক বিষয়ে অথবা পরিবারের কারো সঙ্গে জড়িত হতে চাই না—আমি আমার জীবনের বাকি দিনগুলি কোনও সুদূর অঞ্চলে কাটাব—কিন্তু যতদিন তুমি বেঁচে থাকবে ততদিন কোনও কারণেই প্রতি মাসে তোমাকে ৩০ টাকা পাঠাতে আমার ভুল হবে না।”15 ১৮৭০ সালে বীরসিংহ ত্যাগ করে ভগবতী দেবী কাশীবাসী হন। এর পর মাত্র একবার মায়ের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের দেখা হয়েছিল, যখন কাশীতে তিনি বাবা-মাকে দেখতে আসেন। সেখানে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে ১৮৭১ সালে ভগবতী দেবীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর খবর পেয়ে বিদ্যাসাগর শোকে পাথর হয়ে যান।16
উইল রচনা ও ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা
- নিজ পুত্র নারায়ণচন্দ্র-সহ নিকটজনদের প্রতি প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বিদ্যাসাগর তখন বিভ্রান্ত। ১৮৭৫ সালে বিদ্যাসাগরের বয়স তখন মাত্র ৫৫ বছর। ঐ বছর ৩১ মে তিনি কলকাতায় তাঁর আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে বসে নিজের হাতে পঁচিশটি অনুচ্ছেদে একটি উইল বা ইচ্ছাপত্র লেখেন। বিস্তারিত এই উইলে তিনি নিজের সম্পত্তির তালিকার উল্লেখ করেন, দাতব্য চিকিৎসালয় ও মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়ের জন্যও নির্দেশ রাখেন। এছাড়া তিনি এই উইলে পয়তাল্লিশ জন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট হাতের মাসিক বৃত্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন যাদের মধ্যে ছাব্বিশ জনই ছিলেন বিদ্যাসাগরের অনাত্মীয়।17
- এই ইচ্ছাপত্রের সর্বশেষ অনুচ্ছেদে বিদ্যাসাগরের মনের মর্মভেদী ক্ষোভ ফুটে ওঠে নিজের গভীর স্নেহের একমাত্র পুত্র নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্যে। এই অনুচ্ছেদে বিদ্যাসাগর তাঁর পাঁচ পুত্রকন্যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ এবং একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে ত্যাজ্যপুত্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং নিজ সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে পুত্রকে বঞ্চিত করেন।
- নারায়ণচন্দ্রকে ত্যাজ্যপুত্র করা এবং তাঁকে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার পেছনে বিদ্যাসাগরের গভীর বেদনা নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু এই উইল লেখার পর বিদ্যাসাগর আরও ষোলো বছর বেঁচে থাকলেও উইলের কোনো শব্দ পালটাননি। উইলে তিনি লেখেন— ‘‘আমার পুত্র বলিয়া পরিচিত শ্রীযুক্ত নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় যারপরনাই যথেচ্ছাচারী ও কুপথগামী এজন্য, ও অন্য অন্য গুরুতর কারণবশতঃ আমি তাহার সংশ্রব ও সম্পর্ক পরিত্যাগ করিয়াছি। এই হেতু বশতঃ বৃত্তিনির্বন্ধস্থলে তাঁহার নাম পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং এই হেতুবশতঃ তিনি চতুর্বিংশধারা নির্দিষ্ট ঋণ পরিশোধকালে বিদ্যমান থাকিলেও আমার উত্তরাধিকারী বলিয়া পরিগণিত অথবা… এই বিনিয়োগ পত্রের কার্যদর্শী নিযুক্ত হইতে পারিবেন না।’’18 পুত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও বিদ্যাসাগর তাঁর পুত্রবধূ ভবসুন্দরীর জন্য মাসিক ১৪ টাকা বৃত্তির ব্যবস্থা করে রাখেন।
স্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ
পুত্রের প্রতি স্বামীর এই কঠোর মনোভাব মানতে পারেননি বিদ্যাসাগরের স্ত্রী দীনময়ী দেবী। তাই পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কের ছেদ ঘটার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্ত্রীর সঙ্গেও বিদ্যাসাগরের সম্পর্কের ছেদ ঘটে। বিদ্যাসাগর একদা তাঁর স্ত্রী দীনময়ী দেবীকে এক পত্রে লেখেন— “আমার সাংসারিক সুখভোগের বাসনা পূর্ণ হইয়াছে, আর আমার সে বিষয়ে অণুমাত্র স্পৃহা নাই। বিশেষতঃ ইদানীং আমার মনের ও শরীরের যেরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে। এক্ষণে তোমার নিকটে এ জন্মের মতো বিদায় লইতেছি এবং বিনয় বাক্যে প্রার্থনা করিতেছি, যদি কখন কোনও দোষ বা অসন্তোষের কার্য করিয়া থাকি, দয়া করিয়া আমাকে ক্ষমা করিবে।”19 দীনময়ী দেবী বিদ্যাসাগরের আগে ১৮৮৮ সালে মারা যান। নিজ স্ত্রীর প্রতি বিদ্যাসাগরের অসন্তোষ এতটাই তীব্র ছিল যে, স্ত্রীর মৃত্যুর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের সমস্ত ব্যবস্থা বিদ্যাসাগরই করে দেন। কিন্তু নিজে বীরসিংহ গ্রামে স্ত্রীর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাননি।20
৫. শেষ জীবন, মৃত্যু ও বিদ্যাসাগরের মূল্যায়ন
জীবনের নানা ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, পরিবার, পরিজন, প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, সমাজের নিন্দামন্দ প্রভৃতি বিদ্যাসাগরকে হতাশায় ডুবিয়ে দেয়।
হতাশা ও সমাজ সম্পর্কে আক্ষেপ
বিদ্যাসাগর যা করতে চেয়েছিলেন তার বেশির ভাগটাই করতে পারেননি মানুষের বাধায়। তাই শেষ জীবনে তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন যে, “এদেশের উদ্ধার হইতে বহু বিলম্ব আছে। পুরাতন প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি বিশিষ্ট মানুষের চাষ উঠাইয়া দিয়া সাত পুরু মাটি তুলিয়া ফেলিয়া নতুন মানুষের চাষ করিতে পারিলে, তবে এদেশের ভালো হয়।”
🎓 শিক্ষা সংস্কার
- সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে যুক্ত
- নারীশিক্ষার প্রসার
- বহু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
- শিক্ষাকে সমাজ উন্নয়নের মাধ্যম মনে করতেন
⚖️ সমাজসংস্কার
- বিধবা বিবাহ আন্দোলনের নেতৃত্ব
- রক্ষণশীল সমাজের বিরোধিতা মোকাবিলা
- কুসংস্কার দূরীকরণে যুক্তিবাদী ভূমিকা
- মানবিক মূল্যবোধের প্রচার
📚 সাহিত্য ও ভাষা
- ‘বর্ণপরিচয়’ রচনা
- বাংলা গদ্যকে সহজ ও প্রাঞ্জল করেন
- শিক্ষামূলক গ্রন্থ রচনা
- বাংলা ভাষা শিক্ষাকে সহজ করেন
🌟 ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ
- দারিদ্র্যের মধ্যেও অধ্যবসায়
- মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
- দানশীলতার জন্য ‘দয়ার সাগর’ নামে পরিচিত
- বাংলার নবজাগরণের অন্যতম ব্যক্তিত্ব
কর্মাটাড়ে নিঃসঙ্গ জীবন
- নানা মানসিক আঘাতে জর্জরিত বিদ্যাসাগর শেষজীবনে একটু শান্তির খোঁজে ছুটে যান কলকাতা থেকে বহু দূরে সাঁওতাল-অধ্যুষিত বর্তমান ঝাড়খণ্ডের ছোট্ট স্টেশন কর্মাটাড়-এ। কর্মাটাড়ে ১৮৭৩ সালে গিয়ে বিদ্যাসাগর তাঁর বাকি জীবনের বিভিন্ন সময় সেখানে কাটান। সেখানে প্রকৃতির কোলে একটি ছোট বাড়ি করেন এবং সহজ-সরল সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষের সান্নিধ্যে কিছুটা শান্তিলাভ করেন। তাঁদের চিকিৎসার জন্য বিদেশ থেকে হোমিয়োপ্যাথির বই আনিয়ে ডাক্তারি চর্চা করেন। এভাবেই কর্মাটারে সাঁওতালদের সঙ্গে বিদ্যাসাগর একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন।
- বিশ্বদেব ভট্টাচার্য লিখেছেন— “আদিবাসী মানুষের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তখন দলে দলে সাঁওতাল বিদ্যাসাগরের কাছে আসত ভুট্টা বিক্রি করতে। আর বিদ্যাসাগর সেই ভুট্টা কিনে ঘরে রাখতেন। কাজ শেষে সাঁওতালরা বিকেলে ফেরার পথে খেতে চাইতেন বিদ্যাসাগরের কাছে। ওদের থেকে সকালে কিনে রাখা ভুট্টা খেতে দিতেন বিদ্যাসাগর। কাঠের জালে সেই ভুট্টা ভেজে খেত সাঁওতালরা।”21 প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিদ্যাসাগরের স্মৃতিবিজরিত এই কর্মাটার রেলস্টেশনটির ১৯৭৪ সালে নতুন নামকরণ হয় ‘বিদ্যাসাগর’।22

অসুস্থতা ও দুর্ঘটনা
যাই হোক, সীমাহীন পরিশ্রম আর মানসিক সংকটে বিদ্যাসাগরের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে থাকে। ইতিপূর্বে ১৮৬৬ সালে বিলাতের শিক্ষাবিদ মিস মেরি কার্পেন্টার কলকাতায় আসেন। ভারতে স্ত্রীশিক্ষার বিস্তারে মেরি আগ্রহী ছিলেন। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হওয়ার পর উভয়ে বিভিন্ন স্কুলে বিভিন্ন স্কুল পরিদর্শন করতে থাকেন। ১৮৬৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর উত্তরপাড়ার একটি বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করে বিদ্যাসাগর গাড়ি করে কলকাতায় ফিরছিলেন। অন্য গাড়িতে ছিলেন মেরি। বালি স্টেশনের কাছে বিদ্যাসাগরের গাড়িটি উল্টে যায়। প্রচণ্ড আঘাতে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। মিস মেরি তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। বিখ্যাত ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার জানালেন যে, প্রচণ্ড আঘাতে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসায় ব্যথা কিছুটা কমলেও বাকি জীবনে বিদ্যাসাগর আর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁর লিভারে ক্যান্সার হয়ে যায়।23 ক্যান্সার নিয়ে তিনি ক্রমে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেন।
মৃত্যু (১৮৯১)
- বিদ্যাসাগর ভালোবাসতেন সকলের সঙ্গে থাকতে। পছন্দ করতেন সকলের সঙ্গে আড্ডা দিতে। বাউল আর ফকিরদের গান শুনতে ভালোবাসতেন। কিন্তু তিনি প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করেছেন যে, কাছের মানুষগুলি ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে, চেনা মানুষগুলি কেমন যেন অচেনা হয়ে যাচ্ছে। জীবন সায়াহ্নে তখন তিনি বড় একা। এই অবস্থায় কলকাতার বাদুরবাগানের বাড়ি ছেড়ে দূরে চন্দননগরে গঙ্গার পাড়ে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে মাঝেমধ্যে এখানে এসে থাকেন একান্তে। আর একান্তেই দুঃখের স্মৃতিগুলি তাঁর মনে ভিড় করে আসে। মায়ের স্মৃতিতে ১৮৯০ সালে বীরসিংহ গ্রামে ভগবতী বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
- এদিকে কঠোর পরিশ্রম, মনের হতাশা আর বয়সের ভারে তাঁর শরীর ক্রমে ভেঙে পড়তে থাকে। ফলে ১৮৯১ সালে জুন মাসে স্থায়ীভাবে কলকাতার বাদুড়বাগানের বাড়িতে ফিরে আসেন। অসুখে জর্জরিত বিদ্যাসাগর তখন নতজানু হয়ে পড়েছেন। নামীদামী ডাক্তাররা ক্যান্সার সন্দেহ করলেন। ড. মহেন্দ্রলাল সরকার চিকিৎসায় ত্রুটি রাখলেন না। কিন্তু অসুখ ক্রমে বেড়েই চলল। ২৯ জুলাই (১৮৯১ সাল) শেষ রাতে শয্যাশায়ী বিদ্যাসাগর একবার চোখ মেলে তাকালেন তাঁর পায়ের কাছে বসা একমাত্র পুত্রের মুখপানে। তারপর চিরনিদ্রায় চলে গেলেন বিদ্যাসাগর।24 আর হাজার বছরের বাঙালি জাতির আকাশ থেকে ইন্দ্রপতন ঘটল।
মৃত্যুর পর সম্পত্তি বিতর্ক
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিদ্যাসাগর তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে যে উইল বা ইচ্ছাপত্র রচনা করলেন, মৃত্যুর পর বিদ্যাসাগরের সেই ইচ্ছাও পূর্ণ হল না। কেননা, হিতৈষীদের সহায়তায় তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্র আদালতে মামলা করলেন। তিনি আদালতে যুক্তি দিলেন যে, “উইলে যেহেতু কাউকেই উত্তরাধিকারী বলে নির্দিষ্ট করা হয়নি, তখন একমাত্র পুত্রকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা চলে না।” শেষ পর্যন্ত মামলায় জয়লাভ করে নারায়ণচন্দ্র যথেষ্ট সম্পদের উত্তরাধিকারী হন। তবে সম্পত্তি গ্রহণ করলেও তিনি পিতার বরাদ্দ বৃত্তিগুলির দায় গ্রহণ করলেন না। যাই হোক, বেহিসেবি নারায়ণচন্দ্র উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ ক্রমে নষ্ট করে ফেললেন। প্রথমে বিক্রি করলেন কার্মাটাড়ের বাংলো ও বাগান। বাদুরবাগানের বাড়ি ও বিদ্যাসাগরের বিখ্যাত গ্রন্থাগার বন্ধক দিলেন। বিদ্যাসাগরের বইয়ের কপিরাইটও বন্ধক দিলেন।25

🌟 বিদ্যাসাগর সম্পর্কে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মূল্যায়ন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন: মূল্যায়ন
- জীবনে জন্ম নয়, কর্মই বড়। বিদ্যাসাগর তাঁর কাজের মধ্য দিয়েই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছেন। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না জেনেও বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “আমার জীবনে দু’জন বড় মানুষ, একজন বিদ্যাসাগর, আর অপরজন রামকৃষ্ণ।” আরবিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্তব্য করেছেন যে, ঈশ্বরচন্দ্রের মতো একজন অদম্য চরিত্রের মানুষ কী করে অসম্মান ও গোলামিতে অভ্যস্ত এই বঙ্গদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন— এই ভেবে তিনি অবাক হয়ে যান।26 তাঁর ভাষায়, “বিধাতা সাত কোটি বাঙ্গালী গড়িতে গড়িতে একটি মানুষ সৃষ্টি করিয়াছিলেন।”27
- রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ গ্রন্থে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছেন, “দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব, এবং যতই তাহা অনুভব করিব ততই আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ও বিধাতার উদ্দেশ্যে সফল হইবে, এবং বিদ্যাসাগরের চরিত্র বাঙালির জাতীয় জীবনে চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকিবে।” মহাপুরুষগণ বিদ্যাসাগরকে সম্মান দিলেও তাঁর কাছের মানুষজনই চিরকাল তাঁকে আঘাতে জর্জরিত করে গেছেন। আর আজকের যুগে দুঃখের বিষয় হল— দেশের মানুষ বিদ্যাসাগরকে পূজা করলেও তাঁরা বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক গুণাবলি ও ন্যায়নীতিগুলি জীবনে গ্রহণ করেননি, তাঁর ঋজু এবং সুউচ্চ জীবনবোধকে মডেল হিসেবে বেছে নেননি।28
🌟 বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন
“
দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
“
তাঁহার অজেয় পৌরুষ ও অক্ষয় মনুষ্যত্বই তাঁহার জীবনের প্রধান মহিমা।
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
📜 ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন: ধাপে ধাপে টাইমলাইন
সংগ্রাম, কষ্ট ও অবদানের সম্পূর্ণ ধারাবাহিক চিত্র
🔴 প্রারম্ভিক সাফল্য ও অবদান
বিদ্যাসাগর বাংলার শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও নারীকল্যাণে অসামান্য অবদান রাখেন। ‘বর্ণপরিচয়’-এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষাকে সহজ করেন এবং বহু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
🔴 পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক বিরোধিতা
তিনি শুধু সমাজের নয়, নিজের পরিবার ও শিক্ষিত সমাজের কাছ থেকেও বিরোধিতার সম্মুখীন হন। এমনকি বঙ্কিমচন্দ্রও তাঁকে সমালোচনা করেন।
🔴 পিতা-পুত্র দ্বন্দ্ব ও পারিবারিক সংকট
পুত্র নারায়ণচন্দ্রের অবাধ্যতা ও পিতা ঠাকুরদাসের সঙ্গে মতবিরোধ তাঁর জীবনে গভীর মানসিক আঘাত সৃষ্টি করে।
🔴 চাকরি ত্যাগ ও আর্থিক সংকট
১৮৫৮ সালে অধ্যক্ষ পদ থেকে পদত্যাগের পর সমাজসংস্কারের কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করে তিনি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন।
🔴 বিধবা বিবাহ আন্দোলন
সমাজের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি বিধবা বিবাহ প্রচলন করেন এবং নিজের পুত্রের বিবাহ দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
🔴 পুত্রের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ
পুত্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন এবং ১৮৭৫ সালে উইল রচনা করেন।
🔴 শেষজীবনের নিঃসঙ্গতা
কর্মাটাড়ে বসবাস করে তিনি সাঁওতালদের সেবা করেন এবং নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন।
🏆 মৃত্যু ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
১৮৯১ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও, তাঁর আদর্শ ও মানবিকতা ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে রয়েছে।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
১। আনন্দবাজার পত্রিকা
২। সমকাল পত্রিকা
৩। বাঁধ ভাঙার আওয়াজ (ব্লগ)
৪। শতবর্ষ স্মরণিকা বিদ্যাসাগর কলেজ ১৮৭২-১৯৭২
৫। মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা
📚 আরও জানুন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য জানতে Wikipedia-এ দেখুন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন সম্পর্কে আরও জানতে উইকিপিডিয়া থেকে পড়ুন
⭐⭐⭐⭐ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর ⭐⭐⭐⭐
🎯 Section A- QUIZ: মক টেস্ট দিয়ে নিজেকে যাচাই করুন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মক টেস্ট
আপনার ফলাফল
🎯 Section B-Basic MCQ: নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর MCQ উত্তর দেখুন
এই পেজটি শেয়ার করুন
🎯 Section C-Advanced MCQ: নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর MCQ উত্তর দেখুন
এই পেজটি শেয়ার করুন
🎯 Section D-FAQ: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সংক্রান্ত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কে ছিলেন?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর এক মহান শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও মানবতাবাদী চিন্তাবিদ। তিনি বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
২. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্ম কবে ও কোথায়?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০ সালে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
৩. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রকৃত নাম কী ছিল?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রকৃত নাম ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
৪. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কীভাবে “বিদ্যাসাগর” উপাধি লাভ করেন?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সংস্কৃত ভাষা ও শাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের জন্য সংস্কৃত কলেজ থেকে “বিদ্যাসাগর” উপাধি লাভ করেন।
৫. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রধান অবদান কী?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা শিক্ষার প্রসার, নারীশিক্ষার উন্নয়ন, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন এবং সমাজ সংস্কারে অসামান্য অবদান রাখেন।
৬. ‘বর্ণপরিচয়’ গ্রন্থটি কী এবং কে রচনা করেন?
উত্তর: ‘বর্ণপরিচয়’ একটি প্রাথমিক বাংলা শিক্ষার বই, যা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শিশুদের সহজভাবে বাংলা ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যে রচনা করেন।
৭. বিধবা বিবাহ আন্দোলনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য আন্দোলন পরিচালনা করেন এবং ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাশ করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৮. নারীশিক্ষা প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কী উদ্যোগ গ্রহণ করেন?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বহু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এবং সমাজে নারীশিক্ষার গুরুত্ব প্রচার করে নারীশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৯. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর তারিখ কবে?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ২৯ জুলাই ১৮৯১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
১০. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ‘দয়ার সাগর’ বলা হয় কেন?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অসহায় ও দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতি, দানশীলতা এবং মানবিক আচরণের জন্য ‘দয়ার সাগর’ নামে পরিচিত হন।
১১. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা জীবনের বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও অধ্যবসায় ও মেধার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং সংস্কৃত কলেজে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
১২. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কোন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ছিলেন?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৩. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের মূল লক্ষ্য কী ছিল?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল কুসংস্কার দূর করা, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং শিক্ষার প্রসার ঘটানো।
১৪. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ কী কী?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে ‘বর্ণপরিচয়’, ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ‘শকুন্তলা’ এবং ‘জীবনচরিত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৫. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে সামাজিক ও সাহিত্যিক মতভেদ থাকায় তাদের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল।
১৬. বাংলার নবজাগরণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান কী?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শিক্ষা, সমাজ সংস্কার ও মানবতাবাদী চিন্তার মাধ্যমে বাংলার নবজাগরণকে শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেন।
১৭. বাংলা গদ্যের উন্নয়নে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় গদ্য রচনা করে আধুনিক বাংলা গদ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।
১৮. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনের প্রধান সংগ্রাম কী ছিল?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনের প্রধান সংগ্রাম ছিল সমাজের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে নারী অধিকার ও বিধবা বিবাহ প্রতিষ্ঠা করা।
১৯. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কোন যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণ যুগের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন।
২০. বর্তমান সমাজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রাসঙ্গিকতা কী?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা, নারী অধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত চিন্তাধারা বর্তমান সমাজেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
সূত্র নির্দেশ:
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, স্ত্রীর শ্রাদ্ধেও বাড়ি যাননি তিনি, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১০ জুলাই, ২০১৭। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- শ্রীগিরিজাচরণ ঘোষ, ‘বিদ্যাসাগর-পুত্র নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন’, বিদ্যাসাগর কলেজ শতবর্ষ স্মরণিকা গ্রন্থ, সম্পা. রমাকান্ত চক্রবর্তী, ১৯৭৫, পৃ.-৩২৫। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- আলী আনোয়ার, ‘বিদ্যাসাগর’, বিদ্যাসাগর সংখ্যা, সম্পা. মীজানুর রহমান, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা, এপ্রিল-জুন, ১৯৯৭, (ইন্টারনেট সংস্করণ: https://www.somewhereinblog.net/blog/Nayeem76/30058183) ↩︎
- রামরঞ্জন রায়, ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দেশস্থ পরিবেশ ও তার প্রভাব’, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সম্পা. উৎপল ভট্টাচার্য, ৩৭তম বর্ষ, গ্রীষ্ম, ১৪২৫, কলকাতা, কবিতীর্থ-১০৭, সাহিত্য সংস্কৃতির মননাশ্রয়ী সাময়িকী, পৃ.-১৯২। ↩︎
- শ্রীগিরিজাচরণ ঘোষ, তদেব, পৃ.-৩২৫। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- আলী আনোয়ার, তদেব। ↩︎
- আলী আনোয়ার, তদেব। ↩︎
- বিনয় ঘোষ, বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ, ওরিয়েন্ট লংম্যান, ১৯৭৩, পৃ.- ৪৫৩। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- শিবনারায়ণ রায়, ‘ব্যতিক্রমী এক চরিত্র’, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সম্পা. উৎপল ভট্টাচার্য, ৩৭তম বর্ষ, গ্রীষ্ম, ১৪২৫, কলকাতা, কবিতীর্থ-১০৭, সাহিত্য সংস্কৃতির মননাশ্রয়ী সাময়িকী, পৃ.-১৪১। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- শ্রীগিরিজাচরণ ঘোষ, তদেব, পৃ.-৩২৮। পুনরুল্লেখ: সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- রামরঞ্জন রায়, তদেব, পৃ.-১৯২। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- বিশ্বদেব ভট্টাচার্য, বিদ্যাসাগর স্টেশনের দেওয়ালচিত্রে ঈশ্বরচন্দ্রের জীবনকথা, এই সময় পত্রিকা, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৯। ↩︎
- Brian A. Hatcher, Vidyasagar: The Life and After-life of an Eminent Indian, Routledge, New Delhi, P. XVI. ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, তদেব। ↩︎
- শ্রীগিরিজাচরণ ঘোষ, তদেব, পৃ.-৩২৯-৩৩০। ↩︎
- শিবনারায়ণ রায়, তদেব, পৃ.-১৩৯। ↩︎
- শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, ‘সংস্কৃত পণ্ডিত ও বাংলার নবজাগরণ’, বিদ্যাসাগর কলেজ শতবর্ষ স্মরণিকা গ্রন্থ, সম্পা. রমাকান্ত চক্রবর্তী, ১৯৭৫, পৃ.-২৭৮। ↩︎
- শিবনারায়ণ রায়, তদেব, পৃ.-১৪১। ↩︎
