Bhagat Singh Biography in Bengali (৩০টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য) | জীবন, আন্দোলন ও মৃত্যু

সূচিপত্র hide

Bhagat Singh biography in Bengali : আজকের যুবসমাজের কাছে ভগত সিং শুধুমাত্র এক বিপ্লবী নন, বরং একটি আদর্শ ও চিন্তাধারার প্রতীক। ভগত সিং এর জীবনী তুলে ধরা হয়েছে এই প্রবন্ধে। শহিদ ভগত সিংয়ের জীবন, বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা ও তাঁর আত্মত্যাগের সম্পূর্ণ ইতিহাস সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

লিখেছেন—

ড. সুভাষ বিশ্বাস,

ইতিহাস বিভাগ,

কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়

Bhagat Singh biography in Bengali

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায় যে কটি নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তাদের মধ্যে ‘শহিদ-ই-আজম’ ভগত সিং অন্যতম।1 তিনি কেবল একজন সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন প্রখর চিন্তাবিদ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ধারক।2 মাত্র ২৩ বছরের স্বল্প জীবনে তিনি যেভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, তা আজও আমাদের শিহরিত করে। আজকের এই ব্লগে আমরা তাঁর জীবন, সংগ্রাম এবং আদর্শের গভীরতা বিশ্লেষণ করব।

Bhagat Singh portrait Indian revolutionary freedom fighter India
শহিদ ভগত সিং—ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অগ্নিযুগের বিপ্লবী, যিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
  • ১৯০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর (মতান্তরে ২৮ সেপ্টেম্বর) অবিভক্ত পাঞ্জাবের লয়ালপুর জেলার বঙ্গে এক শিখ পরিবারে ভগত সিং জন্মগ্রহণ করেন।3 তাঁর পরিবার ছিল আদ্যোপান্ত বিপ্লবী চেতনায় সমৃদ্ধ। বাবা কিশন সিং এবং কাকা অজিত সিং দুজনেই ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় সৈনিক।
  • ফলে শৈশব থেকেই ভগত সিং-এর মধ্যে এক অদম্য দেশপ্রেম লক্ষ্য করা যেত। একটি জনপ্রিয় লোকগাথা অনুযায়ী, শৈশবে তিনি জমিতে বন্দুক পুঁতে রাখতেন যাতে ‘বন্দুকের গাছ’ জন্মায় এবং তা দিয়ে ব্রিটিশদের তাড়ানো যায়। পরিবারের বড়দের জেল খাটা এবং আত্মত্যাগ তাঁর কচি মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
  • ভগত সিংয়ের শিক্ষাজীবন কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল জাতীয়তাবাদী চেতনা ও বিপ্লবী আদর্শে গঠিত এক বিশেষ অধ্যায়। তিনি প্রাথমিকভাবে লাহোরের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও অল্প বয়সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রভাবে তাঁর চিন্তাধারা পরিবর্তিত হতে থাকে।
  • বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি লাহোরের ন্যাশনাল কলেজে ভর্তি হন, যা লালা লাজপত রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই কলেজটি ব্রিটিশ শিক্ষানীতির বিকল্প হিসেবে জাতীয়তাবাদী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এখানে তিনি শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানই অর্জন করেননি, বরং স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিপ্লবী ইতিহাস এবং রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করেন।
  • লালা লাজপত রায়ের ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব ভগত সিংয়ের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর আদর্শ, দেশপ্রেম এবং ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম ভগত সিংকে আরও দৃঢ়ভাবে বিপ্লবী পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। এছাড়া তিনি ইউরোপীয় বিপ্লব, সমাজতন্ত্র এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কেও বিস্তৃতভাবে অধ্যয়ন করেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ভিত্তি গঠন করে।
  • এইভাবে, ভগত সিংয়ের শিক্ষাজীবন কেবলমাত্র একাডেমিক নয়, বরং জাতীয়তাবাদ, সমাজচিন্তা এবং বিপ্লবী আদর্শে সমৃদ্ধ এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে ভারতীয় ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিওয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড ভগত সিং-এর জীবনকে আমূল বদলে দেয়।4 তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে তিনি পায়ে হেঁটে অমৃতসর পৌঁছান এবং শহিদদের রক্তে ভেজা মাটি একটি বোতলে ভরে নিয়ে আসেন। সেই রক্তমাখা মাটিই ছিল তাঁর বিপ্লবের প্রথম দীক্ষা।

“জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড কিশোর ভগত সিংয়ের জীবনে এক গভীর মানসিক বিপ্লব ঘটায়। শহিদদের রক্তমাখা মাটি তাঁর কাছে হয়ে ওঠে দেশপ্রেম, প্রতিশোধ ও আত্মত্যাগের প্রতীক। এই ঘটনার অভিঘাতই পরবর্তীকালে তাঁকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।”

https://lekhaporaonline.com/%e0%a6%ad%e0%a6%97%e0%a6%a4-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%82-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a7%80-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%8d

শুরুতে ভগত সিং মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে আস্থাশীল ছিলেন। ১৯২১ সালে গান্ধীজির ডাকে তিনি স্কুল ত্যাগ করেন এবং বিদেশি বস্ত্র পোড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। কিন্তু ১৯২২ সালের ‘চৌরিচৌরা’ ঘটনার পর গান্ধীজি হঠাৎ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে তরুণ ভগত সিং-এর মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।5 তিনি বুঝতে পারেন, কেবল অহিংসার মাধ্যমে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

  • ভগত সিং কেবল একজন বিপ্লবী কর্মীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক গভীর চিন্তাশীল রাজনৈতিক মননসম্পন্ন ব্যক্তি, যার আদর্শ ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি ভিন্নধারার প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
  • প্রথমত, ভগত সিং সমাজতন্ত্রে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে, প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই সম্ভব যখন সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হবে এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি সমাজব্যবস্থা, যেখানে শোষণ ও বৈষম্যের কোনো স্থান থাকবে না। এই চিন্তাধারা থেকেই তিনি হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA)-এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেন।
  • দ্বিতীয়ত, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থক। তাঁর মতে, ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়, এবং রাষ্ট্র বা রাজনীতিতে এর কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ধর্মীয় বিভাজন ভারতীয় সমাজকে দুর্বল করে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই তিনি সর্বদা জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ঐক্যবদ্ধ ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
  • তৃতীয়ত, ভগত সিংয়ের চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর নাস্তিকতা, যা তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “Why I am an Atheist”-এ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই লেখায় তিনি যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক মনোভাবের মাধ্যমে নিজের নাস্তিক বিশ্বাস ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং যুক্তি ও প্রমাণের উপর নির্ভর করে চলা উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও গভীর ও আধুনিক করে তোলে।
  • সব মিলিয়ে, ভগত সিংয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শ ছিল সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে। তাঁর এই প্রগতিশীল চিন্তাধারা আজও সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক এবং নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

বিপ্লবী ভগত সিং ১৯২৪ সালে শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ও যোগেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’-এ যোগ দেন। পরবর্তীকালে চন্দ্রশেখর আজাদের সাথে মিলে তিনি এর নামকরণ করেন ‘হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ (HSRA)।6 এখান থেকেই তাঁর বৈপ্লবিক ভাবধারা সমাজতান্ত্রিক দিকে মোড় নেয়। তিনি কেবল ব্রিটিশ বিতাড়ন নয়, বরং কৃষক ও শ্রমিকের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

Chandra Shekhar Azad Indian revolutionary freedom fighter photo
চন্দ্রশেখর আজাদ — হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের (HSRA) অন্যতম নেতা ও ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রদূত
https://lekhaporaonline.com/%e0%a7%a7%e0%a7%af%e0%a7%ad%e0%a7%ab-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a6%bf-%e0%a6%85%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%be-%e0%a6%ad

১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী মিছিলে পুলিশি লাঠিচার্জে বর্ষীয়ান নেতা লালা লাজপত রায়ের মৃত্যু হলে সারা ভারত স্তম্ভিত হয়ে যায়।7 এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেব ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার জেমস স্কটকে মারার পরিকল্পনা করেন।8 কিন্তু ভুলবশত তাঁরা জন স্যান্ডার্সকে গুলি করে হত্যা করেন।9 এই ঘটনা ব্রিটিশ শাসনের গালে ছিল এক চপেটাঘাত।

Shivaram Rajguru Indian revolutionary and associate of Bhagat Singh
শহীদ শিবরাম রাজগুরু — ভগত সিংয়ের সহযোদ্ধা ও ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম নেতা

ব্রিটিশদের দমনমূলক ‘পাবলিক সেফটি বিল’ এবং ‘ট্রেড ডিসপিউটস বিল’-এর প্রতিবাদে ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লির সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ করেন।10 তাঁদের উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা ছিল না, বরং ‘বধির ব্রিটিশ সরকারকে শোনানো’ ছিল মূল লক্ষ্য।11 তাঁরা সেখানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন এবং স্বেচ্ছায় ধরা দেন।12

Sukhdev Thapar Indian revolutionary and associate of Bhagat Singh
শহীদ সুখদেব থাপার — ভগত সিং ও রাজগুরুর সহযোদ্ধা, ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম নেতা
https://lekhaporaonline.com/%e0%a7%a7%e0%a7%aa%e0%a6%87-%e0%a6%86%e0%a6%97%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%9f-%e0%a7%a7%e0%a7%af%e0%a7%aa%e0%a7%ad-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a6%be

জেলে থাকাকালীন ভগত সিং ভারতীয় কয়েদিদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তিনি এবং যতীন দাস রাজনৈতিক বন্দিদের মর্যাদার দাবিতে টানা অনশন শুরু করেন। ৬৩ দিন অনশনের পর যতীন দাস শহিদ হন13, কিন্তু ভগত সিং তাঁর সংগ্রাম চালিয়ে যান। এই সময় তিনি প্রচুর বই পড়েন এবং তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Why I am an Atheist’ (আমি কেন নাস্তিক) রচনা করেন।

স্যান্ডার্স হত্যা মামলায় (লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা) ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ২৪ মার্চ ফাঁসির দিন ধার্য থাকলেও ব্রিটিশ সরকার গণ-অভ্যুত্থানের ভয়ে ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় গোপনে তাঁদের ফাঁসি কার্যকর করে।14 ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তিনি লেনিনের জীবনী পড়ছিলেন।15 বীরের মতো হাসি মুখে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে ওঠেন।16

  • ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশ সরকার লাহোর জেলে ফাঁসি দেয়। যদিও এটি ছিল একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত, তবুও ভারতের জনগণের কাছে এই ঘটনা ছিল গভীরভাবে আবেগঘন ও রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক। তাঁদের ফাঁসি কেবল তিনজন বিপ্লবীর মৃত্যু নয়, বরং সমগ্র ভারতীয় জাতির আত্মসম্মানে এক গভীর আঘাত হিসেবে প্রতিভাত হয়।
  • ভগত সিংয়ের ফাঁসির পর সারা ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিভিন্ন শহরে শোক মিছিল, ধর্মঘট এবং প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ—সবাই এই ঘটনার নিন্দা জানান। অনেকেই মনে করেছিলেন, ব্রিটিশ সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করে জনরোষ এড়াতে চেয়েছিল। ফলে এই ঘটনা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমতকে আরও তীব্র করে তোলে।
  • বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে ভগত সিংয়ের আত্মত্যাগ এক নতুন জাগরণের সূচনা করে। তাঁর সাহস, আত্মবলিদান এবং আদর্শ তরুণদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা জাগিয়ে তোলে। অনেক যুবক তাঁকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে। ভগত সিং এক প্রতীকে পরিণত হন—যে প্রতীক নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের।
  • এইভাবে, ভগত সিংয়ের ফাঁসি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং তা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে যে চেতনার জন্ম হয়, তা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার লড়াইকে আরও শক্তিশালী ও ব্যাপক করে তোলে।

পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য (Quick Facts)

  • জন্ম: ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯০৭।
  • বিপ্লবী সংগঠন: নওজোয়ান ভারত সভা (১৯২৬), HSRA (১৯২৮)।
  • বিখ্যাত স্লোগান: ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
  • ফাঁসির তারিখ: ২৩ মার্চ, ১৯৩১ (লাহোর সেন্ট্রাল জেল)।
  • সহযোগী: রাজগুরু, সুখদেব, চন্দ্রশেখর আজাদ, বটুকেশ্বর দত্ত।

Bhagat Singh biography in Bengali আলোচনায় বটুকেশ্বর দত্তের এই ঐতিহাসিক ছবিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

Batukeshwar Dutt Lahore Conspiracy Case 1930 historical photo
লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার সময় বটুকেশ্বর দত্তের বিরল ঐতিহাসিক ছবি (প্রায় ১৯৩০)

শহিদ ভগত সিং কেবল এক ঐতিহাসিক চরিত্র নন, তিনি এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা। তাঁর সমাজতান্ত্রিক দর্শন এবং দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জনের মানসিকতা আমাদের শেখায় যে, আদর্শের জন্য লড়াই করাই প্রকৃত জীবন। আজকের ছাত্রসমাজ ও যুবসমাজের কাছে তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এক একটি আদর্শের পাঠশালা।

ক্র. নংগুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ভগত সিং ১৯০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের লয়ালপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা কিশন সিং এবং কাকা অজিত সিং ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী।
ভগত সিংকে ‘শহিদ-ই-আজম’ নামে অভিহিত করা হয়।
তিনি শৈশব থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব পোষণ করতেন।
১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
তিনি লাহোর ন্যাশনাল কলেজে পড়াশোনা করেন।
ভগত সিং ১৯২৬ সালে নওজোয়ান ভারত সভা প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA)-এর সদস্য ছিলেন।
ভগত সিং সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন।
১০তিনি লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে উদ্যোগী হন।
১১১৯২৮ সালে তিনি জন স্যান্ডার্সকে হত্যা করেন।
১২এই হত্যাকাণ্ডে রাজগুরু ও সুখদেব তাঁর সহযোগী ছিলেন।
১৩ভগত সিং ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান জনপ্রিয় করেন।
১৪১৯২৯ সালে তিনি দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ করেন।
১৫বোমা নিক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের সতর্ক করা, হত্যা করা নয়।
১৬তিনি বটুকেশ্বর দত্তের সাথে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন।
১৭জেলে তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকারের জন্য অনশন করেন।
১৮তাঁর অনশন ৬৩ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
১৯তিনি জেলে বসে ‘Why I am an Atheist’ প্রবন্ধটি লেখেন।
২০ভগত সিং মার্কসবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত ছিলেন।
২১লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
২২১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
২৩তাঁর বয়স তখন মাত্র ২৩ বছর ছিল।
২৪তাঁর সাথে রাজগুরু ও সুখদেবকেও একই দিনে ফাঁসি দেওয়া হয়।
২৫তাঁকে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি দেওয়া হয়।
২৬মৃত্যুর আগে তিনি লেনিনের জীবনী পড়ছিলেন।
২৭তাঁর দেহ গোপনে দাহ করা হয় ব্রিটিশদের দ্বারা।
২৮ভগত সিং ভারতের যুবসমাজের অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত।
২৯তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী ধারার অন্যতম নেতা।
৩০ভগত সিং আজও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক অমর প্রতীক।

ভগত সিং সম্পর্কে আরও বিশদে জানতে এখানে ক্লিক করুন

ব্রিটানিকা থেকে বিপ্লবী ভগত সিং বিষয়ক প্রবন্ধটি পড়ুন

এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলে শেয়ার করুন এবং কমেন্টে জানান আপনি ভগত সিং-এর কোন আদর্শে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত।

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে নিয়মিত ইতিহাসের বিভিন্ন লেখালিখি এবং আপডেট পেতে এখানে ক্লিক করুন

ভগত সিং: ইন্টারঅ্যাক্টিভ মক টেস্ট

ভগত সিং-এর জীবন, বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, HSRA, লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা ও আত্মত্যাগ নিয়ে ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ MCQ।

Section B-Basic MCQ: নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন

১. ভগত সিং কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
ক) ১৯০৫ সালে
খ) ১৯০৭ সালে
গ) ১৯১০ সালে
ঘ) ১৯১২ সালে
উত্তর: খ) ১৯০৭ সালে

২. ১৯১৯ সালের কোন নৃশংস ঘটনা ভগত সিং-এর বৈপ্লবিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?
ক) চৌরিচৌরা কাণ্ড
খ) জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড
গ) রাওলাট অ্যাক্ট
ঘ) বঙ্গভঙ্গ
উত্তর: খ) জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড

৩. ভগত সিং ১৯২৬ সালে কোন যুব সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?
ক) অনুশীলন সমিতি
খ) নওজোয়ান ভারত সভা
গ) গদর পার্টি
ঘ) বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স
উত্তর: খ) নওজোয়ান ভারত সভা

৪. কার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ভগত সিং জন সন্ডার্সকে হত্যা করেছিলেন?
ক) মহাত্মা গান্ধী
খ) বাল গঙ্গাধর তিলক
গ) লালা লাজপত রায়
ঘ) চিত্তরঞ্জন দাশ
উত্তর: গ) লালা লাজপত রায়

৫. ভগত সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত কত সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ করেন?
ক) ১৯২৭ সালে
খ) ১৯২৮ সালে
গ) ১৯২৯ সালে
ঘ) ১৯৩০ সালে
উত্তর: গ) ১৯২৯ সালে (৮ এপ্রিল)

৬. আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের সময় ভগত সিং-এর মূল লক্ষ্য কী ছিল?
ক) ব্রিটিশ ভাইসরয়কে হত্যা করা
খ) আইনসভা ভবন উড়িয়ে দেওয়া
গ) বধির ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করা
ঘ) নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করা
উত্তর: গ) বধির ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করা

৭. ভগত সিং-এর দেওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগানটি কী ছিল?
ক) জয় হিন্দ
খ) বন্দে মাতরম্
গ) ইনকিলাব জিন্দাবাদ
ঘ) দিল্লি চলো
উত্তর: গ) ইনকিলাব জিন্দাবাদ

৮. কারাবন্দি থাকাকালীন ভগত সিং-এর লেখা বিখ্যাত প্রবন্ধটির নাম কী?
ক) ভারত ও বিপ্লব
খ) কেন আমি নাস্তিক (Why I am an Atheist)
গ) স্বাধীনতার পথ
ঘ) আমার জীবন কথা
উত্তর: খ) কেন আমি নাস্তিক

৯. ভগত সিং-এর সাথে আর কোন দুই বিপ্লবীর একই দিনে ফাঁসি হয়েছিল?
ক) রাজগুরু ও সুখদেব
খ) চন্দশেখর আজাদ ও যতিন দাস
গ) ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী
ঘ) সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদার
উত্তর: ক) রাজগুরু ও সুখদেব

১০. ভগত সিং কত বছর বয়সে শহিদ হয়েছিলেন?
ক) ২১ বছর
খ) ২৩ বছর
গ) ২৫ বছর
ঘ) ৩০ বছর
উত্তর: খ) ২৩ বছর


Section D-FAQ: /// সংক্রান্ত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

১. ভগত সিং-কে কেন ‘শহিদ-ই-আজম’ বলা হয়?

উত্তর: ‘শহিদ-ই-আজম’ শব্দের অর্থ হলো ‘মহান শহিদ’। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অতুলনীয় সাহস, দেশপ্রেম এবং মাত্র ২৩ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরায় তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে।

২. ভগত সিং কেন আইনসভায় বোমা ফেলার পর পালিয়ে যাননি?

উত্তর: ভগত সিং চেয়েছিলেন তাঁর বিচারের মাধ্যমে বিপ্লবের বাণী সারা ভারতের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে গ্রেপ্তার হওয়াকে বেশি কার্যকর মনে করেছিলেন যাতে আদালতকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

৩. এইচএসআরএ (HSRA) কী?

উত্তর: এর পূর্ণরূপ হলো ‘Hindustan Socialist Republican Association’। ভগত সিং এবং চন্দ্রশেখর আজাদের নেতৃত্বে এই সংগঠনটি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করত।

৪. ভগত সিং-এর রাজনৈতিক আদর্শ কী ছিল?

উত্তর: ভগত সিং কেবল ব্রিটিশদের দেশ থেকে তাড়াতে চাননি, তিনি এমন একটি সমাজ চেয়েছিলেন যেখানে মানুষের ওপর মানুষের কোনো শোষণ থাকবে না। তিনি সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন।

৫. ২৩শে মার্চ দিনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: ১৯৩১ সালের ২৩শে মার্চ লাহোর জেলে ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই তিন বীরের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর ভারতে এই দিনটিকে ‘শহিদ দিবস’ (Martyrs’ Day) হিসেবে পালন করা হয়।

৬. ভগত সিং কে ছিলেন?

উত্তর: ভগত সিং ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন বিপ্লবী নেতা

৭. ভগত সিং কেন বিখ্যাত?

উত্তর: ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ও আত্মত্যাগের জন্য।

৮. ভগত সিংকে কবে ফাঁসি দেওয়া হয়?

উত্তর: ২৩ মার্চ ১৯৩১ সালে।

  1. Bipan Chandra et al., India’s Struggle for Independence, Penguin Books, 1989, p. 250. ↩︎
  2. K.N. Panikkar, Against Lord and State: Religion and Peasant Uprisings in Malabar, Oxford University Press, 1999, p. 198. ↩︎
  3. Sumit Sarkar, Modern India 1885–1947, Macmillan, 1983, p. 310. ↩︎
  4. Bipan Chandra, India’s Struggle for Independence, Penguin Books, 1989, p. 196. ↩︎
  5. Sekhar Bandyopadhyay, From Plassey to Partition, Orient BlackSwan, 2004, p. 352. ↩︎
  6. Bipan Chandra et al., India’s Struggle for Independence, Penguin Books, 1989, p. 258. ↩︎
  7. Sumit Sarkar, Modern India 1885–1947, Macmillan, 1983, p. 314. ↩︎
  8. Bipan Chandra et al., India’s Struggle for Independence, Penguin Books, 1989, p. 259. ↩︎
  9. Sekhar Bandyopadhyay, From Plassey to Partition, Orient BlackSwan, 2004, p. 353. ↩︎
  10. Bipan Chandra et al., India’s Struggle for Independence, Penguin Books, 1989, p. 261. ↩︎
  11. A.G. Noorani, The Trial of Bhagat Singh, Oxford University Press, 1996, p. 45. ↩︎
  12. Bipan Chandra et al., India’s Struggle for Independence, Penguin Books, 1989, p. 262. ↩︎
  13. Sekhar Bandyopadhyay, From Plassey to Partition, Orient BlackSwan, 2004, p. 354. ↩︎
  14. Bipan Chandra et al., India’s Struggle for Independence, Penguin Books, 1989, p. 263. ↩︎
  15. Kuldip Nayar, The Martyr: Bhagat Singh – Experiments in Revolution, HarperCollins, 2000, p. 210. ↩︎
  16. Trial Proceedings of Lahore Conspiracy Case (1930). ↩︎

1 thought on “Bhagat Singh Biography in Bengali (৩০টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য) | জীবন, আন্দোলন ও মৃত্যু”

  1. Pingback: All History Posts - Subhas Biswas – Lekhapora

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top