Bharatiya jatiyotabad বা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ উনিশ শতকের ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ভূমিকা:
ভারতীয় সমাজ ছিল বরাবরই বহুত্ববাদী। বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও ভাষার সমন্বয়ে গঠিত ভারতীয় সমাজে বহু বৈচিত্র্য ছিল। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এই বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারতীয় সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিক শোষণ ও অত্যাচার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রভৃতি বিষয়গুলি এই সময় ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। ভারতে জাতীয়তাবাদের বিকাশের সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল—
1. জাতি-বিদ্বেষ:
ব্রিটিশরা দৈনন্দিন জীবনে ভারতীয়দের প্রতি সর্বদাই তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করত। চার্লস গ্রান্ট-এর মতে, ভারতীয়রা হল “একটি ঘৃণিত ও শোচনীয়ভাবে অধঃপতিত জাতি।”রাজা রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখের মতো প্রতিষ্ঠিত মনীষীরাও ব্রিটিশদের দ্বারা অপমানিত হয়েছেন। বর্ণ-শ্রেষ্ঠত্বের নির্লজ্জ ও স্পর্ধিত প্রকাশ, ভারতীয়দের উপর লাঞ্ছনা প্রভৃতি কোনো ভারতীয়ের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। এই অপমানবোধ ভারতীয়দের জাতীয়তাবাদকে উজ্জীবিত করে।

2. পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ভারতীয় সমাজ:
ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বহুলাংশে পাশ্চাত্য শিক্ষার পালিত পুত্র। ঐতিহাসিক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, একসময় ভারতের পাশ্চাত্য ভাবধারায় শিক্ষিত রাজনৈতিক নেতারা ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দাঁড় করান। পাশ্চাত্য শিক্ষার সংস্পর্শে এসে ভারতবাসী ইউরোপীয় রাষ্ট্রনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, সাম্য, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে। এভাবে ভারতীয়দের চিন্তাধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। ইংরেজি ভাষা বিভিন্ন অঞ্চলের ভারতীয়দের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের বাহক হয়ে ওঠে। এভাবে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে সমগ্র ভারতে এক ঐক্যবোধ জাগ্রত হয়।
3. ধর্ম ও সমাজসংস্কার আন্দোলন:
রাজা রামমোহন রায়, কেশবচন্দ্র সেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখের সক্রিয় উদ্যোগে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার এবং স্যার সৈয়দ আহম্মদ খানের নেতৃত্বে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘটিত আলিগড় আন্দোলন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রকে উর্বর করে তোলে। স্বামী দয়ানন্দের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল জাতীয় স্বাধীনতা। কেশবচন্দ্র সেন সর্বপ্রথম সারা ভারত ভ্রমণ করে তাঁর মতবাদ প্রচারের মাধ্যমে ভারতের জাতীয় ঐক্যের চিন্তাকে মজবুত করেন। পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করার জন্য বিবেকানন্দ যুব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

4. শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব: ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উদ্ভবের একটি প্রধান কারণ ছিল। ইংরেজি শিক্ষার জন্য এরা সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তি ভোগ করত। শিক্ষকতা, আইন পেশা, ব্যবসা, সাংবাদিকতা, সরকারি চাকরি প্রভৃতি ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের বৃত্তি। সিপাহী বিদ্রোহের পর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীই জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রচারের ঐতিহাসিক দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়।
5. সংবাদপত্র ও জনমত গঠন
উনিশ শতকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলি ব্রিটিশ শাসনের অন্যায় নীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে। অমৃতবাজার পত্রিকা, হিন্দু প্যাট্রিয়ট, দ্য বেঙ্গলি প্রভৃতি সংবাদপত্র জাতীয় চেতনার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একে অপরের সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারে এবং তাদের মধ্যে ঐক্যের অনুভূতি সৃষ্টি হয়।
6. পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি
ব্রিটিশ শাসনামলে রেলপথ, ডাকব্যবস্থা ও টেলিগ্রাফের উন্নতি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে একত্রিত করে এবং তাদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান সহজ করে তোলে। ফলে সর্বভারতীয় চেতনা গড়ে ওঠে এবং জাতীয় ঐক্যের ধারণা শক্তিশালী হয়।
7. ব্রিটিশ অর্থনৈতিক শোষণ
ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। উচ্চ কর, ধনসম্পদের বহিঃপ্রবাহ (Drain of Wealth), দেশীয় শিল্পের ধ্বংস প্রভৃতি কারণে ভারতীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। দাদাভাই নওরোজির ড্রেন তত্ত্ব ভারতীয়দের চোখে ব্রিটিশ শোষণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় এবং জাতীয়তাবাদের বোধ জাগ্রত হয়।

8. ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কার
উনিশ শতকে ভারতীয়রা নিজেদের অতীত ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুনভাবে সচেতন হয়ে ওঠে। প্রাচীন ভারতের গৌরবময় ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে আত্মসম্মান ও গৌরববোধ বৃদ্ধি পায়। এই সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
9. জাতীয় সংগঠনের উদ্ভব
উনিশ শতকের শেষভাগে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্ভব ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশকে ত্বরান্বিত করে। ভারত সভা (Indian Association), বম্বে অ্যাসোসিয়েশন, পূণা সর্বজনিক সভা প্রভৃতি সংগঠন ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করে। এই সংগঠনগুলির অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।
উপসংহার:
- উপরোক্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কারণগুলির সম্মিলিত প্রভাবে Bharatiya jatiyotabad বা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। এই সমস্ত কারণের ফলে ভারতবাসীর মনে স্বদেশের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ধীরে ধীরে ভারতীয়রা তাদের হতাশা ও হীনমন্যতা অতিক্রম করে এক আত্মপ্রত্যয়সম্পন্ন ও বলিষ্ঠ মানসিকতার অধিকারী হয়ে ওঠে। তারা ব্রিটিশ শাসন ও শোষণকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করে এবং জাতীয় চেতনার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে।
- ফলে বলা যায়, উনিশ শতকের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে। ঐতিহাসিক এ. আর. দেশাই-এর মতে, “ভারতে প্রথম জাতীয় জাগরণ ঘটে সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন থেকেই।” এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূল শিকড় নিহিত ছিল সমাজ ও সংস্কৃতির গভীরে।
আরও পড়ুন: Social Background of Indian Nationalism
ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সামাজিক পটভূমি সম্পর্কে আরও জানতে উইকিপিডিয়া থেকে পড়ুন
————– ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সামাজিক পটভূমি সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর —————
Section A- QUIZ: মক টেস্ট দিয়ে নিজেকে যাচাই করুন
ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ: ইন্টারঅ্যাক্টিভ মক টেস্ট
২০টি গুরুত্বপূর্ণ MCQ, সঙ্গে সঠিক উত্তর, ব্যাখ্যা, স্কোর ও সাউন্ড ফিডব্যাক।
🎉 আপনার ফলাফল
Section B-Basic MCQ: নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন
ভারতীয় জাতীয়তাবাদ: MCQ Answer Reveal
Section C-Advanced MCQ: নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন
ভারতীয় জাতীয়তাবাদ: Advanced MCQ Answer Reveal
Section D-FAQ: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ১৮৮৫ সংক্রান্ত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলতে ভারতবাসীর মধ্যে জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত চেতনার বিকাশকে বোঝায়।
২. উনিশ শতকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উত্থানের প্রধান কারণ কী ছিল?
উত্তর: ব্রিটিশ শাসনের শোষণ, পাশ্চাত্য শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল প্রধান কারণ।
৩. ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক কে?
উত্তর: অনেক ঐতিহাসিক সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে, অনেকে দাদাভাই নওরোজিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম জনক হিসেবে বিবেচনা করেন।
৪. ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সূচনা কখন হয়?
উত্তর: উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সুসংগঠিত বিকাশ শুরু হয়।
৫. পাশ্চাত্য শিক্ষা কীভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে প্রভাবিত করে?
উত্তর: পাশ্চাত্য শিক্ষার মাধ্যমে ভারতীয়রা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমতার ধারণা সম্পর্কে সচেতন হয়, যা জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৬. সংবাদপত্র কীভাবে জাতীয়তাবাদ গঠনে সাহায্য করে?
উত্তর: সংবাদপত্র ব্রিটিশ শোষণ প্রকাশ করে জনমত তৈরি করে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলে।
৭. মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী জাতীয়তাবাদী চিন্তা প্রচার ও রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
৮. ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন কীভাবে জাতীয়তাবাদকে প্রভাবিত করে?
উত্তর: ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন মানুষের মধ্যে আত্মসম্মান ও ঐক্যের চেতনা তৈরি করে, যা জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে।
৯. ড্রেন তত্ত্ব (Drain Theory) কী?
উত্তর: দাদাভাই নওরোজির ড্রেন তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে চলে যেত, ফলে ভারত দরিদ্র হয়ে পড়ে।
১০. ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে “পাশ্চাত্য শিক্ষার পালিত পুত্র” বলা হয় কেন?
উত্তর: কারণ পাশ্চাত্য শিক্ষাই ভারতীয়দের মধ্যে আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা ও জাতীয় ঐক্যের ধারণা তৈরি করে।
১১. পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি কীভাবে জাতীয়তাবাদকে প্রভাবিত করে?
উত্তর: রেল, টেলিগ্রাফ ও ডাকব্যবস্থা ভারতীয়দের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে এবং সর্বভারতীয় চেতনা গড়ে তোলে।
১২. ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা জাতীয়তাবাদের উপর কী প্রভাব ফেলে?
উত্তর: এটি জাতীয় আন্দোলনকে সংগঠিত রূপ দেয় এবং রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার কেন্দ্র তৈরি করে।
সূত্রনির্দেশ:
