ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু রহস্য: স্বাধীন ভারতের এক কালজয়ী ট্র্যাজেডি

সূচিপত্র hide

ভারতের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হলো শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু ১৯৫৩ (‘Shyama Prasad Mookerjee death mystery’ )।1 কাশ্মীরের শ্রীনগরে বন্দিদশায় তাঁর এই প্রয়াণ আজও অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।2 এই দিনেই কাশ্মীরের বন্দিদশায় রহস্যজনকভাবে প্রয়াত হন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Dr. Syama Prasad Mookerjee)। ভারতমাতার এই বীর সন্তানের মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক ক্ষতি ছিল না, বরং তা জন্ম দিয়েছিল অসংখ্য প্রশ্নের, যার উত্তর আজও ইতিহাসের অন্ধকারে ঢাকা। আজকের এই নিবন্ধে আমরা তাঁর জীবন, আদর্শ এবং সেই রহস্যময় অন্তিম মুহূর্তগুলোর নির্মোহ বিশ্লেষণ করব।

লিখেছেন—

ড. সুভাষ বিশ্বাস,

ইতিহাস বিভাগ,

কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি ১৯৫৩ কাশ্মীর আন্দোলন
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় – কাশ্মীর ইস্যু ও ‘এক দেশ এক সংবিধান’ আন্দোলনের প্রধান মুখ, যার মৃত্যু আজও রহস্যে ঘেরা।

বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য পুত্র ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং দৃঢ়চেতা জাতীয়তাবাদী নেতা। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে3 অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের রাজনীতিতেও তিনি এক অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় যখন সমগ্র বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা4 তৈরি হয়েছিল, তখন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দৃঢ় নেতৃত্ব প্রদান করেন। তিনি ‘বেঙ্গল পার্টিশন’ আন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রাখার জন্য জোরালো দাবি জানান।5

তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন— “হিন্দুদের জন্য একটি নিরাপদ ভূখণ্ড হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ হতে হবে।” তাঁর এই রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও আপসহীন সংগ্রামের ফলেই কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত থাকে। তাই তাঁকে যথার্থই “পশ্চিমবঙ্গের ত্রাতা” বলা হয়। এই ভূমিকা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে।

Dr Syama Prasad Mookerjee with Dr B R Ambedkar historical meeting image
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও ড. বি.আর. আম্বেদকর—ভারতের দুই প্রভাবশালী নেতার ঐতিহাসিক মুহূর্ত

ড. মুখোপাধ্যায় কেবল হিন্দু নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। নেহরু সরকার যখন সংবিধানে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা সংকুচিত করতে চেয়েছিল6, তখন সংসদে দাঁড়িয়ে শ্যামাপ্রসাদ এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি নেহরুকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন— “আপনি বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চাইছেন।”

  • স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কংগ্রেস সরকারের নীতির সঙ্গে একাধিক ক্ষেত্রে মতানৈক্যে জড়িয়ে পড়েন। তিনি প্রথমে নেহেরু মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে কাজ করলেও, দেশের স্বার্থবিরোধী বলে মনে হওয়া কিছু নীতির বিরোধিতা করেন।
  • বিশেষত, ১৯৫০ সালের ‘নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি’-র7 ফলে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু শরণার্থীদের যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়ায় তিনি প্রতিবাদস্বরূপ মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এটি স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর প্রথম পদত্যাগের ঘটনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
  • পরবর্তীকালে ১৯৫১ সালে তিনি ‘ভারতীয় জনসংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন8, যা আজকের ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এই দল গঠনের মাধ্যমে তিনি বিকল্প জাতীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করেন এবং ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করেন।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায় ছিল কাশ্মীর প্রশ্নে তাঁর দৃঢ় অবস্থান। স্বাধীনতার পর জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য পৃথক সংবিধান, পৃথক পতাকা এবং ‘পারমিট সিস্টেম’-এর মতো বিশেষ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান।9 তৎকালীন পরিস্থিতিতে, ভারতের অন্য প্রান্ত থেকে জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশ করতে হলে ভারতীয় নাগরিকদের বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হতো, যা তিনি জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, একটি স্বাধীন দেশের মধ্যে এ ধরনের পৃথক ব্যবস্থা দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংহতিকে দুর্বল করে।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন—
👉 “এক দেশ, এক সংবিধান, এক নিশান—দুই ব্যবস্থা চলবে না।”10

এই স্লোগান শুধু একটি রাজনৈতিক দাবি নয়, বরং ভারতের অখণ্ডতা রক্ষার একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।

১৯৫৩ সালের ৮ই মে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ জানাতে এক ঐতিহাসিক অভিযান শুরু করেন।11 তাঁর এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল—পারমিট ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং কাশ্মীরকে সম্পূর্ণভাবে ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। এই অভিযানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন তরুণ নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী। কোনো ধরনের সরকারি অনুমতি ছাড়াই তিনি যখন জম্মু সীমান্তে প্রবেশ করেন, তখন শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কাশ্মীর সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে।12 এই গ্রেফতার শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি সমগ্র দেশের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং কাশ্মীর ইস্যুকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

মৃত্যুর আগে শেষ দিনগুলোতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (১৯৫৩)
মৃত্যুর আগে শ্রীনগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (১৯৫৩)
  • গ্রেফতারের পর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে শ্রীনগরের নিকটবর্তী একটি নির্জন ও অস্বাস্থ্যকর কুটিরে আটক রাখা হয়।13 ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সেই জায়গার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল—অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা, অনিরাপদ আবাসন এবং প্রশাসনিক অবহেলা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।
  • তৎকালীন সময়ে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৫২ বছর, এবং তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন। তাঁর মা যোগমায়া দেবী অভিযোগ করেন যে, তাঁর পুত্রকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি এবং তাঁর জীবনরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসন উদাসীন ছিল।
  • ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু ঘটে14, যা আজও ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তাঁর মৃত্যু শুধুমাত্র একটি স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না, বরং রাজনৈতিক অবহেলা বা ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
১৯৫৩ সালে মৃত্যুর পর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক ছবি
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরের ঐতিহাসিক মুহূর্ত (১৯৫৩)
  • ১৯শে জুন: তাঁর পায়ে ব্যথা এবং জ্বর শুরু হয়।
  • ২০শে জুন: তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় কিন্তু কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছিল না।
  • ২২শে জুন: অবস্থার অবনতি হয় এবং অক্সিজেন সিলিন্ডারের অভাব দেখা দেয়।
  • ২৩শে জুন: রহস্যজনক মৃত্যু।

আরও পড়ুন: স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ও জনসংঘের ভূমিকা

(Was a Fatal Injection Administered in the Name of Treatment?)

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু (১৯৫৩)-কে ঘিরে অন্যতম বড় বিতর্ক তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে। ১৯৫৩ সালের ২০শে জুন অসুস্থ বোধ করলে তাঁকে শ্রীনগরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁকে ‘স্ট্রেপটোমাইসিন’ (Streptomycin) নামক একটি অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেওয়া হয়15, যা তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতির সঙ্গে যুক্ত বলে বহু ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

🔸 অ্যালার্জির সতর্কতা (Allergy Warning)

ড. মুখোপাধ্যায় পূর্বেই তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. আলি মোহাম্মদকে জানিয়েছিলেন যে, স্ট্রেপটোমাইসিনের প্রতি তাঁর মারাত্মক অ্যালার্জি রয়েছে।16 এই তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার গাফিলতি বা অবহেলার প্রশ্ন উত্থাপন করে।

🔸 জোরপূর্বক প্রয়োগ ও পরিণতি (Forced Administration & Consequences)

ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা তাঁকে সেই ইনজেকশন দেন এবং এর পরপরই তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। ২৩শে জুন তিনি তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফলে এই চিকিৎসা পদ্ধতি আদৌ সঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

(Reluctance of Nehru Government to Investigate & the Mystery)

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর (১৯৫৩) পর তাঁর মৃত্যু-পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ওঠে, যা পরবর্তী সময়ে আরও গভীর সন্দেহের জন্ম দেয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর মা যোগমায়া দেবী নেহরুকে লিখেছিলেন— “আমি আপনার কাছে কোনো দয়া ভিক্ষা করছি না, আমি বিচার চাইছি।”

🔸 ময়নাতদন্তের অভাব (Absence of Autopsy)

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর কোনো ময়নাতদন্ত (Autopsy) করা হয়নি17, যা স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

🔸 পরিবারের দাবি ও সরকারের প্রতিক্রিয়া (Family’s Demand & Government Response)

তাঁর মা যোগমায়া দেবী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে চিঠি লিখে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান। কিন্তু সেই দাবি সরকারিভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়, যা রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উস্কে দেয়।

🔸 মরদেহ সংক্রান্ত বিতর্ক (Controversy over the Dead Body)

তাঁর মরদেহ প্রথমে দিল্লিতে আনা হয়নি এবং সরাসরি কলকাতায় পাঠানো হয়। এই ঘটনাও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ জাগায়।

🔸 রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া (Political Reactions)

পরবর্তীকালে অটল বিহারী বাজপেয়ী সহ বহু রাজনৈতিক নেতা এই ঘটনাকে প্রকাশ্যে “রাজনৈতিক হত্যা” (Political Assassination) বলে উল্লেখ করেন।18 যদিও এর পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও এই দাবি দীর্ঘদিন ধরে জনমনে আলোড়ন সৃষ্টি করে রেখেছে।

মৃত্যু রহস্যের আলোচনায় তৎকালীন কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।কেন তাঁকে শ্রীনগর হাসপাতাল থেকে দূরে ডাল লেকের পাশের একটি কুঠুরিতে রাখা হয়েছিল? কেন তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিল্লির এইমস (AIIMS) বা অন্য কোথাও স্থানান্তরিত করা হয়নি? শেখ আবদুল্লাহ এবং নেহরুর মধ্যকার পত্রালাপের কিছু অংশ এখানে যোগ করা যায়।

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের কয়েক দশক পর, ২০১৯ সালে ভারত সরকার যখন ৩৭০ ধারা (Article 370) বিলোপ করে, তখন তাঁর সেই ঐতিহাসিক স্বপ্ন পূরণ হয়। ভারতের অখণ্ডতা রক্ষায় তাঁর আত্মত্যাগ আজও কোটি কোটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা। তাঁর মৃত্যু রহস্যের সঠিক তদন্ত হয়তো কোনোদিন হয়নি, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তিনি অমর হয়ে আছেন।

আরও পড়ুন: ৩৭০ ধারা বিলোপ এবং ড. মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নের বাস্তবায়ন

পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি (Quick Recap)

ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার্থে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিচে দেওয়া হলো:

  • 🔸 ১৯৫০ – নেহরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ
    ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৫০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
    👉 কারণ: ‘নেহরু-লিয়াকত চুক্তি’-র ফলে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় তিনি প্রতিবাদ জানান।
    👉 এটি স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদত্যাগ হিসেবে বিবেচিত।

    🔸 ২১শে অক্টোবর, ১৯৫১ – ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠা
    তিনি ২১ অক্টোবর, ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ (Bharatiya Jana Sangh) প্রতিষ্ঠা করেন।
    👉 এই দলই পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)-র আদর্শিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
    👉 এর মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের বিকল্প শক্তির উত্থান ঘটে।

    🔸 বিখ্যাত স্লোগান
    👉 “এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধান এবং দুই নিশান চলবে না।”
    👉 (One Nation, One Constitution, One Head, One Flag)
    এই স্লোগান কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার বিরুদ্ধে তাঁর আন্দোলনের মূল আদর্শ প্রকাশ করে।

    🔸 ৮ই মে, ১৯৫৩ – কাশ্মীর অভিযানের সূচনা
    ড. মুখোপাধ্যায় কাশ্মীরের পারমিট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ঐতিহাসিক কাশ্মীর অভিযান শুরু করেন।
    👉 লক্ষ্য: জম্মু ও কাশ্মীরকে সম্পূর্ণভাবে ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা।
    👉 তাঁর সঙ্গে ছিলেন তরুণ নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী।

    🔸 ১১ই মে, ১৯৫৩ – কাশ্মীরে গ্রেফতার
    তিনি কোনো পারমিট ছাড়াই জম্মু-কাশ্মীর প্রবেশ করলে
    👉 মাধবপুর চেকপোস্টে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
    👉 শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন সরকার তাঁকে আটক করে।
    👉 এই ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

    🔸 জুন, ১৯৫৩ – অসুস্থতা ও চিকিৎসা বিতর্ক
    গ্রেফতারের পর শ্রীনগরে বন্দি অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
    👉 চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় (বিশেষত স্ট্রেপটোমাইসিন ইনজেকশন নিয়ে)।
    👉 যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

    🔸 ২৩শে জুন, ১৯৫৩ – রহস্যময় মৃত্যু
    👉 সময়: ভোর ৩টা ৪০ মিনিট
    👉 স্থান: শ্রীনগর
    ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘটে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে।
    👉 ময়নাতদন্ত (Autopsy) না হওয়ায় এই মৃত্যু আজও বিতর্কিত।
    👉 অনেকের মতে, এটি রাজনৈতিক অবহেলা বা ষড়যন্ত্রের ফলও হতে পারে।

এই ঐতিহাসিক নোটটি আপনার ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আপনাদের মতামত কমেন্ট বক্সে জানাতে ভুলবেন না।

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: ইন্টারঅ্যাক্টিভ মক টেস্ট

প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিন, সঙ্গে সঙ্গে ব্যাখ্যা দেখুন এবং নিজের স্কোর যাচাই করুন।

Question 1 of 15 Score: 0 🔥 Streak: 0

আপনার ফলাফল

15মোট প্রশ্ন
0সঠিক উত্তর
0%শতাংশ

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: Answer Reveal MCQ

প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে বাটনে ক্লিক করুন।

আপনি ০ টি উত্তর দেখেছেন
🎉 আপনি সব উত্তর দেখে ফেলেছেন!


১. ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কে ছিলেন?

উত্তর: ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় শিক্ষাবিদ, ব্যারিস্টার এবং রাজনীতিবিদ। তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী এবং ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

২. কেন তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠাতা বা রূপকার বলা হয়?

উত্তর: ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় সমগ্র বঙ্গপ্রদেশ যাতে পাকিস্তানে চলে না যায়, তার জন্য তিনি তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই হিন্দু প্রধান এলাকাগুলো নিয়ে আজকের পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যায়।

৩. তিনি কেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন?

উত্তর: ১৯৫০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘নেহরু-লিয়াকত চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। শ্যামাপ্রসাদ মনে করেছিলেন এই চুক্তি পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হবে। এই মতবিরোধের জের ধরেই তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

৪. কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: তিনি কাশ্মীরের জন্য আলাদা সংবিধান (বিধান), আলাদা পতাকা (নিশান) এবং আলাদা প্রধানমন্ত্রীর (প্রধান) বিরোধী ছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসেবে কাশ্মীরেও ভারতের জাতীয় আইন পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতে হবে।

৫. তাঁর মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক কেন?

উত্তর: ১৯৫৩ সালে অনুমতি ছাড়াই কাশ্মীরে প্রবেশের অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। বন্দি অবস্থায় শ্রীনগরে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও তাঁর অনুগামীরা তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মানতে চাননি এবং এর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছিলেন।

৬. ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবদান কী?

উত্তর: তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের একজন শক্তিশালী প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ভারতীয় জনসঙ্ঘ’ থেকেই পরবর্তীতে আজকের ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) উদ্ভূত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নেও তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে।

৭. ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কবে মারা যান?

উত্তর: ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৫৩ সালের ২৩শে জুন ভোরে কাশ্মীরের শ্রীনগরে বন্দিদশায় মারা যান।

৮. শ্যামাপ্রসাদ কোন দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

উত্তর: ১৯৫১ সালের ২১শে অক্টোবর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘ভারতীয় জনসংঘ’ (Bharatiya Jana Sangh) প্রতিষ্ঠা করেন। এই দলটিই বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) আদর্শিক পূর্বসূরি হিসেবে পরিচিত।

৯. শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর কারণ কী ছিল?

উত্তর: সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘হৃদরোগ’ বা হার্ট অ্যাটাক (Coronary Thrombosis) উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর এই মৃত্যু ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক ও রহস্য রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, তাঁর ‘স্ট্রেপ্টোমাইসিন’ ওষুধের ওপর মারাত্মক অ্যালার্জি থাকা সত্ত্বেও জেলের চিকিৎসকরা তাঁকে জোরপূর্বক সেই ইঞ্জেকশন দিয়েছিলেন, যার ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং মৃত্যু হয়। তাঁর অনুগামী ও পরিবারের সদস্যরা একে ‘পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ বলে দাবি করেন।

  1. H.V. Seshadri, Dr. Syama Prasad Mookerjee: His Life and Times, Sahitya Sindhu, Bangalore, p. 215. ↩︎
  2. Tathagata Roy, The Life and Times of Dr. Syama Prasad Mookerjee, Penguin India, 2010, p. 178. ↩︎
  3. Haridas Mukherjee & Uma Mukherjee, The Life and Times of Dr. Syama Prasad Mookerjee, Firma KLM, Calcutta, p. 52. ↩︎
  4. Sekhar Bandyopadhyay, From Plassey to Partition and After, Orient BlackSwan, 2015, p. 430. ↩︎
  5. Joya Chatterji, Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947, Cambridge University Press, p. 245. ↩︎
  6. Granville Austin, The Indian Constitution: Cornerstone of a Nation, Oxford University Press, p. 79. ↩︎
  7. Sumit Sarkar, Modern India: 1885–1947, Macmillan, p. 448. ↩︎
  8. Christophe Jaffrelot, The Hindu Nationalist Movement and Indian Politics, Penguin Books, p. 112. ↩︎
  9. Alastair Lamb, Kashmir: A Disputed Legacy 1846–1990, Oxford University Press, p. 245. ↩︎
  10. Tathagata Roy, The Life and Times of Dr. Syama Prasad Mookerjee, Penguin India, p. 182. ↩︎
  11. H.V. Seshadri, Dr. Syama Prasad Mookerjee: His Life and Times, p. 221. ↩︎
  12. Ramachandra Guha, India After Gandhi, Picador India, p. 232. ↩︎
  13. Tathagata Roy, The Life and Times of Dr. Syama Prasad Mookerjee, p. 185. ↩︎
  14. Haridas Mukherjee, Syama Prasad Mookerjee: A Biographical Study, p. 198. ↩︎
  15. M.J. Akbar, Kashmir: Behind the Vale, Viking, p. 156. ↩︎
  16. Tathagata Roy, The Life and Times of Dr. Syama Prasad Mookerjee, p. 187. ↩︎
  17. Ramachandra Guha, India After Gandhi, p. 233. ↩︎
  18. Christophe Jaffrelot, The Hindu Nationalist Movement and Indian Politics, p. 115. ↩︎

1 thought on “ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু রহস্য: স্বাধীন ভারতের এক কালজয়ী ট্র্যাজেডি”

  1. Pingback: All History Posts in Bengali | Indian History Articles, Notes, MCQ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top