ভগত সিং বনাম গান্ধী: মহাত্মা কি পারতেন শহিদ ভগত সিংয়ের ফাঁসি আটকাতে? ইতিহাসের অজানা অধ্যায়

⚔️ ভূমিকা:

ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পার হয়ে গেলেও আজও ইতিহাসের অলিন্দে একটি প্রশ্ন বারবার প্রতিধ্বনিত হয়— মহাত্মা গান্ধী কি পারতেন ভগত সিংয়ের ফাঁসি আটকাতে? ১৯৩১ সালের ২৩ শে মার্চ লাহোর সেন্ট্রাল জেলে যখন ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবের ফাঁসি হয়, তখন সমগ্র ভারতবর্ষ শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই নিবন্ধে আমরা অনুসন্ধান করব সেই রক্তঝরা দিনগুলোর ইতিহাস, যেখানে একদিকে ছিল গান্ধীর অহিংস নীতি আর অন্যদিকে ভগত সিংয়ের আপসহীন বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্র।

⚔️ ১. বিচারের নামে প্রহসন: লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার আইনি অসংগতি

ভগত সিংয়ের বিচার প্রক্রিয়া ছিল ব্রিটিশ আইনের এক চূড়ান্ত নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ভাইসরয় লর্ড আরউইন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন। এমনকি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই অর্ডিন্যান্স পাশ করে এই বিচার চালানো হয়। হংসরাজ ভোরা ও ফনীন্দ্রনাথ ঘোষের মতো বিশ্বাসঘাতক সঙ্গীদের অর্থের বিনিময়ে সাক্ষী সাজিয়ে ব্রিটিশ সরকার এই ‘আইনি হত্যা’ নিশ্চিত করেছিল। ভারতের তৎকালীন আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বিচার প্রক্রিয়াটি আগাগোড়াই ছিল অসাংবিধানিক।

⚔️ ২. আদর্শিক সংঘাত: গান্ধী বনাম ভগত সিং

গান্ধী ও ভগত সিংয়ের মধ্যে মূল পার্থক্য ছিল স্বাধীনতার সংজ্ঞায়।

  • ভগত সিংয়ের সমাজতন্ত্র: ভগত সিং কেবল ব্রিটিশদের বিতাড়ন নয়, বরং সমাজ থেকে শোষণের চিরস্থায়ী অবসান চেয়েছিলেন। তিনি HSRA (Hindustan Socialist Republican Association) গঠনের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ভারতের স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর মনন জগতে কার্ল মার্কস, লেনিন এবং ভলতেয়ারের গভীর প্রভাব ছিল।
  • গান্ধীর অহিংসা: গান্ধী বিশ্বাস করতেন নৈতিক জয় ও হৃদয়ের পরিবর্তনে। ভগত সিংয়ের সশস্ত্র বিপ্লবকে তিনি ভারতের সংস্কৃতির পরিপন্থী বলে মনে করতেন।

⚔️ ৩. চৌরিচৌরা ও মোহভঙ্গ

১৯২২ সালে চৌরিচৌরা ঘটনার পর যখন গান্ধীজি আকস্মিক অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন, তখন তরুণ ভগত সিংয়ের মনে গান্ধীর নেতৃত্বের প্রতি গভীর অনাস্থা তৈরি হয়। ব্রিটিশের অত্যাচারের মুখে দাঁড়িয়ে একটি ছোট হিংসার ঘটনার জন্য কোটি কোটি মানুষের আন্দোলন থামিয়ে দেওয়াকে ভগত সিং ‘বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখেছিলেন। এখান থেকেই তাঁর নিজস্ব বৈপ্লবিক পথ চলা শুরু।

⚔️ ৪. বধিরকে শোনাতে বজ্রনিনাদ: অ্যাসেম্বলি বোমা হামলা

১৯২৯ সালে দিল্লির সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত যে বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন, তার উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা ছিল না। তাঁরা লিফলেট ছড়িয়ে পরিষ্কার জানিয়েছিলেন— “To make the deaf hear” (বধিরকে শোনাতেই এই বজ্রধ্বনি)। সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তাঁরা স্যান্ডার্সকে হত্যা করলেও, ব্যক্তিগত হিংসা তাঁদের লক্ষ্য ছিল না; লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে কাঁপিয়ে দেওয়া।

⚔️ ৫. যতীন দাসের আত্মত্যাগ ও গান্ধীর শীতল প্রতিক্রিয়া

জেলের ভেতরে রাজবন্দিদের মর্যাদা আদায়ের দাবিতে ভগত সিংরা ঐতিহাসিক অনশন শুরু করেন। ৬৩ দিনের দীর্ঘ অনশনের পর শহিদ হন বিপ্লবী যতীন দাস। সমগ্র দেশ যখন উত্তাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন যতীন দাসের স্মৃতিতে গান বাঁধছেন, সুভাষচন্দ্র বসু যখন তাঁর শেষযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন— তখন গান্ধীজি এই আত্মত্যাগকে ‘এক প্রকার আত্মহত্যা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। গান্ধীর এই শীতল আচরণ বিপ্লবী শিবিরের সাথে তাঁর দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

⚔️ ৬. গান্ধী-আরউইন চুক্তি ও ফাঁসি আটকানোর শেষ সুযোগ

১৯৩১ সালের গান্ধী-আরউইন চুক্তির সময় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, গান্ধীজি হয়তো ভগত সিংদের মুক্তি বা সাজা কমানোর শর্ত রাখবেন।

  • গান্ধীর প্রচেষ্টা: গান্ধীজি আরউইনকে ফাঁসি স্থগিত করার অনুরোধ করেছিলেন সত্য, কিন্তু তিনি এটিকে চুক্তির প্রধান শর্ত হিসেবে রাখেননি।
  • সুভাষচন্দ্রের পরামর্শ: সুভাষচন্দ্র বসু পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, ভগত সিংয়ের প্রশ্নে প্রয়োজনে গান্ধীজির উচিত ভাইসরয়ের সাথে আলোচনা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা। কিন্তু গান্ধীজি তাঁর অহিংসার আদর্শে এতটাই অনড় ছিলেন যে, সহিংস বিপ্লবীদের জন্য তিনি চূড়ান্ত রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে চাননি।1

⚔️ ৭. উপসংহার: ইতিহাসের নিষ্ঠুর সত্য

২৩ শে মার্চ সন্ধ্যায় নির্ধারিত সময়ের আগেই ভগত সিংদের ফাঁসি দিয়ে দেওয়া হয়। গান্ধীজি পরবর্তীকালে জানিয়েছিলেন যে, বিপ্লবীদের কৃতকর্মের জন্য তিনি লজ্জিত ছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গান্ধীজি তাঁর নিজস্ব আদর্শিক গণ্ডির উপরে উঠতে পারেননি। মহাত্মা গান্ধী হয়তো মহৎ ছিলেন, কিন্তু ভগত সিংয়ের ফাঁসি আটকানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা আজও অমীমাংসিত বিতর্কের জন্ম দেয়।

আজকের স্বাধীন ভারত শহিদ ভগত সিংকে তাঁর বীরত্বের জন্য মনে রাখে, আর সেই রক্তঝরা ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— স্বাধীনতা কখনও দান হিসেবে আসেনি, তা ছিনিয়ে নিতে হয়েছে জীবনের বিনিময়ে।

নিজেকে যাচাই করতে নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন

১. ভগত সিং এবং মহাত্মা গান্ধীর লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য এক থাকলেও কিসে বড় পার্থক্য ছিল?
ক) লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যে
খ) আন্দোলনের পদ্ধতিতে (মতাদর্শে)
গ) বিদেশি ভাষার ব্যবহারে
ঘ) জাতীয় পতাকার ডিজাইনে
উত্তর: খ) আন্দোলনের পদ্ধতিতে (গান্ধী ছিলেন অহিংসপন্থী এবং ভগত সিং ছিলেন বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী)

২. কত সালে গান্ধী-আরউইন চুক্তি (Gandhi-Irwin Pact) স্বাক্ষরিত হয়েছিল?
ক) ১৯২৯ সালে
খ) ১৯৩০ সালে
গ) ১৯৩১ সালে
ঘ) ১৯৩২ সালে
উত্তর: গ) ১৯৩১ সালে (৫ মার্চ)

৩. গান্ধী-আরউইন চুক্তির সময় কোন ধরনের বন্দিদের মুক্তির কথা বলা হয়েছিল?
ক) সকল বন্দিদের
খ) যারা কোনো হিংসাত্মক কাজে যুক্ত ছিল না (অহিংস রাজনৈতিক বন্দি)
গ) যারা কেবল ছাত্র ছিল
ঘ) যাদের ফাঁসির সাজা হয়েছিল
উত্তর: খ) যারা কোনো হিংসাত্মক কাজে যুক্ত ছিল না

৪. ভগত সিং-এর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার সময় ভারতের ভাইসরয় কে ছিলেন?
ক) লর্ড কার্জন
খ) লর্ড আরউইন
গ) লর্ড মাউন্টব্যাটেন
ঘ) লর্ড ডালহৌসি
উত্তর: খ) লর্ড আরউইন

৫. ভগত সিং-এর ফাঁসি রোধে গান্ধীর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসে প্রধান বিতর্কটি কী?
ক) তিনি ফাঁসি সমর্থন করেছিলেন
খ) তিনি কেন ফাঁসি রদ করাকে চুক্তির প্রধান শর্ত করেননি
গ) তিনি ভগত সিং-কে চিনতেন না
ঘ) তিনি ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিলেন
উত্তর: খ) তিনি কেন ফাঁসি রদ করাকে চুক্তির প্রধান শর্ত করেননি

৬. মহাত্মা গান্ধী ভগত সিং-এর বীরত্ব সম্পর্কে কী বলেছিলেন?
ক) তিনি ভগত সিং-এর সাহসের প্রশংসা করেছিলেন কিন্তু পদ্ধতির বিরোধিতা করেছিলেন
খ) তিনি ভগত সিং-কে ঘৃণা করতেন
গ) তিনি তাঁকে একজন সাধারণ অপরাধী মনে করতেন
ঘ) তিনি কোনো মন্তব্য করেননি
উত্তর: ক) তিনি ভগত সিং-এর সাহসের প্রশংসা করেছিলেন কিন্তু পদ্ধতির বিরোধিতা করেছিলেন

৭. ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে কত তারিখে ফাঁসি দেওয়া হয়?
ক) ২৬ জানুয়ারি ১৯৩১
খ) ১৫ আগস্ট ১৯৩১
গ) ২৩ মার্চ ১৯৩১
ঘ) ২ অক্টোবর ১৯৩১
উত্তর: গ) ২৩ মার্চ ১৯৩১

৮. গান্ধী কেন সশস্ত্র বিপ্লব সমর্থন করতেন না?
ক) তিনি ব্রিটিশদের ভয় পেতেন
খ) তিনি মনে করতেন হিংসা কেবল ধ্বংসই আনে এবং নৈতিক জয় দেয় না
গ) তিনি বিপ্লবীদের পছন্দ করতেন না
ঘ) তিনি কেবল নিজের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইতেন
উত্তর: খ) তিনি মনে করতেন হিংসা কেবল ধ্বংসই আনে এবং নৈতিক জয় দেয় না

৯. ফাঁসির দিন সকালে গান্ধী লর্ড আরউইনকে কী অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন?
ক) ফাঁসি কার্যকর করতে
খ) ফাঁসি অন্তত কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখতে
গ) ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তে
ঘ) সব বিপ্লবীকে গ্রেফতার করতে
উত্তর: খ) ফাঁসি অন্তত কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখতে

১০. ভগত সিং-এর ফাঁসির পর করাচি কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে গান্ধী কোন পরিস্থিতির মুখে পড়েন?
ক) মানুষের বিপুল অভ্যর্থনা
খ) কালো পতাকা প্রদর্শন ও তীব্র বিক্ষোভ
গ) তাঁকে গ্রেফতার করা হয়
ঘ) কোনোটিই নয়
উত্তর: খ) কালো পতাকা প্রদর্শন ও তীব্র বিক্ষোভ


প্রয়োজনীয় কিছু FAQ (সাধারণ জিজ্ঞাসা)

১. মহাত্মা গান্ধী কি ভগত সিং-এর ফাঁসি চেয়েছিলেন?

উত্তর: না, গান্ধী কখনোই ব্যক্তিগতভাবে ভগত সিং-এর ফাঁসি চাননি। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে সাজা কমানোর বা স্থগিত করার অনুরোধও করেছিলেন। তবে তিনি যেহেতু অহিংসার কট্টর সমর্থক ছিলেন, তাই ভগত সিং-এর সশস্ত্র বিপ্লবের পথকে তিনি রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করতে পারেননি।

২. কেন বলা হয় যে গান্ধী ভগত সিং-কে বাঁচাতে পারতেন?

উত্তর: অনেক ইতিহাসবিদ ও সমালোচকদের মতে, ১৯৩১ সালের গান্ধী-আরউইন চুক্তির সময় গান্ধী যদি শর্ত দিতেন যে ভগত সিং-এর ফাঁসি রদ না করলে তিনি চুক্তিতে সই করবেন না, তবে হয়তো ব্রিটিশ সরকার নতি স্বীকার করত। গান্ধী এই দাবিটি দৃঢ়ভাবে না জানানোই বিতর্কের মূল কারণ।

৩. ভগত সিং ও গান্ধীর মধ্যে মূল আদর্শগত পার্থক্য কী ছিল?

উত্তর: গান্ধী বিশ্বাস করতেন ‘অহিংসা’ এবং ‘সত্যাগ্রহে’, যেখানে শত্রুর মন জয় করে স্বাধীনতা আনা সম্ভব। অন্যদিকে, ভগত সিং বিশ্বাস করতেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে এবং মনে করতেন শোষক ব্রিটিশদের তাড়াতে প্রয়োজনবোধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা ন্যায্য।

৪. ভগত সিং কি গান্ধীর আন্দোলনের সমালোচনা করেছিলেন?

উত্তর: ভগত সিং গান্ধীর ব্যক্তিগত সততা এবং গণআন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তবে তিনি মনে করতেন গান্ধীর ‘অহিংসা’ নীতি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য যথেষ্ট নয় এবং এটি সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

৫. গান্ধী-আরউইন চুক্তিতে বিপ্লবীদের কথা কেন ছিল না?

উত্তর: ব্রিটিশ সরকার পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল যে, যারা সন্ডার্স হত্যা বা বোমা নিক্ষেপের মতো ‘হিংসাত্মক’ ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, তাদের মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। গান্ধী মূলত অহিংস আন্দোলনে যুক্ত হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি নিশ্চিত করতেই চুক্তিতে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

৬. ভগত সিং-এর ফাঁসির পর জনগণের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

উত্তর: ভগত সিং-এর ফাঁসি সারা ভারতে শোক ও রাগের ছায়া ফেলেছিল। বিশেষ করে তরুণ সমাজ গান্ধীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল কারণ তাদের ধারণা ছিল গান্ধী চাইলেই এই ফাঁসি আটকাতে পারতেন। করাচি অধিবেশনে গান্ধীকে কালো পতাকা দেখানো এই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল।

  1. Collected Works of Mahatma Gandhi (CWMG), Volume 45. ↩︎

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top