[বন্দে মাতরম গানের অর্থ, বন্দে মাতরম গানের ইতিহাস, বন্দে মাতরম কার লেখা, আনন্দমঠ উপন্যাস।National Song of India history, Bankim Chandra Chattopadhyay, Vande Mataram meaning and history]
ভূমিকা:
ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ‘বন্দে মাতরম্’ কেবল একটি গান নয়, এটি ছিল পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তির মূলমন্ত্র। উনিশ শতকের শেষার্ধে এই গানটি ভারতবাসীর মনে যে দেশপ্রেমের জোয়ার এনেছিল, তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর লেখনীর মাধ্যমে দেশমাতৃকাকে যে জীবন্ত রূপ দিয়েছিলেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই মহান সংগীত। এটি সাহিত্য, সংগীত ও রাজনীতির এক অনন্য মিলনস্থল।

উৎপত্তি ও রচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে (সম্ভবত ১৮৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর) ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি রচনা করেছিলেন।1 পরবর্তীকালে ১৮৮২ সালে তাঁর কালজয়ী রাজনৈতিক উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ তিনি এই গানটি অন্তর্ভুক্ত করেন।2 উপন্যাসটির পটভূমি ছিল ১৭৭০ সালের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ এবং তৎকালীন ‘সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ’।3 বঙ্কিমচন্দ্র যখন এটি রচনা করেন, তখন তিনি সরকারি চাকুরে ছিলেন। জনশ্রুতি আছে যে, ট্রেনের কামরায় যাওয়ার সময় ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে তিনি এই গানের প্রথম কয়েকটি কলি লিখেছিলেন। উপন্যাসের মূল চরিত্র ভবানন্দ এই গানটি গাওয়ার মাধ্যমে দেশপ্রেমের এক নতুন আদর্শ তুলে ধরেন। এই গানটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর এটি আরও জনপ্রিয় হয়।

বন্দে মাতরম্ সঙ্গীতের কিছু ভার্সন
বন্দেমাতরম: সম্পূর্ণ মূল গান (সংস্কৃত ও বাংলা মিশ্রিত)
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত মূল গানটি নিচে দেওয়া হলো:
বন্দে মাতরম্।সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্শস্যশ্যামলাং মাতরম্।।শুভ্রজ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্সুখদাং বরদাং মাতরম্।।
(পরবর্তী অংশ যা সাধারণত গাওয়া হয় না কিন্তু মূল উপন্যাসে আছে):কোটি কোটি কণ্ঠ-কল-কল-নিনাদ-করালেকোটি কোটি ভুজৈর্ধৃত-খরকরবালেঅবলা কেন মা এত বলে!বহুবলধারিণীং নমামি তরিণীংরিপুদলবারিণীং মাতরম্।।
তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম তুমি হৃদি তুমি মর্মত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে।বাহুতে তুমি মা শক্তি হৃদয়ে তুমি মা ভক্তিতোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।।
ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণীকমলা কমলদলবিহারিণীবাণী বিদ্যাদায়িনী নমামি ত্বাম্নমামি কমলাং অমলাং অতুলাম্সুজলাং সুফলাং মাতরম্।।
বন্দে মাতরম্।শ্যামলাং সরলাং সুস্মিতাং ভূষিতাম্ধরণীং ভরণীং মাতরম্।।
শ্রী অরবিন্দ কর্তৃক ইংরেজি অনুবাদ
Mother, I bow to thee!
Rich with thy hurrying streams,
bright with orchard gleams,
Cool with thy winds of delight,
Dark fields waving Mother of might,
Mother free.
Glory of moonlight dreams,
Over thy branches and lordly streams,
Clad in thy blossoming trees,
Mother, giver of ease,
Laughing low and musical!
Mother, I kiss thy feet,
Speaker sweet and low,
Mother, to thee I bow.

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক বঙ্গানুবাদ
বন্দনা করি মায়!
সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা, চন্দন-শীতলায়!
যাঁহার জ্যোৎস্না-পুলকিত রাতি
যাঁহার ভূষণ বনফুল পাঁতি,
সুহাসিনী সেই মধুরভাষিণী–সুখদায়–বরদায়!
বন্দনা করি মায়!

জাতীয় স্তোত্র হিসেবে গৃহীত অংশ
বন্দে মাতরম্
সুজলাং সুফলাং
মলয়জশীতলাং
শস্যশ্যামলাং
মাতরম্।
শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্,
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্
সুখদাং বরদাং মাতরম্।

আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদ ও দেশমাতৃকার বন্দনা
বঙ্কিমচন্দ্রের এই গানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো আধ্যাত্মিকতার সাথে দেশপ্রেমের মেলবন্ধন। তিনি ভারতবর্ষকে কেবল একটি মানচিত্র বা ভৌগোলিক সত্তা হিসেবে দেখেননি; তিনি দেশকে দেবী দুর্গার রূপে কল্পনা করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়, দেশমাতৃকা হলো— “সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা”।
এই রূপকের মাধ্যমে তিনি ভারতবাসীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মাতৃভূমির সেবা করা আর ঈশ্বরের আরাধনা করা অভিন্ন। তিনি লিখেছিলেন— “ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে” অর্থাৎ তুমিই শরীরের প্রাণ। এই ‘আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদ’ সাধারণ মানুষের মনে আবেগ, ভক্তি ও আত্মত্যাগের এক চরম প্রেরণা সৃষ্টি করেছিল। দেশমাতৃকাকে মা হিসেবে আরাধনা করার এই পরিকল্পনা তৎকালীন যুবসমাজকে দেশসেবায় পাগল করে তুলেছিল।
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম্’
বন্দেমাতরম-এর প্রভাব
উনিশ ও বিংশ শতকের শুরুতে ‘বন্দে মাতরম্’ হয়ে ওঠে স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল স্লোগান।
- ১৮৯৬ সালের জাতীয় কংগ্রেস অধিবেশন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমবার কংগ্রেসের মঞ্চে এই গানটিতে সুর দিয়ে গেয়েছিলেন।4
- বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন (১৯০৫): লর্ড কার্জন যখন বাংলা ভাগ করেন, তখন এই গানটিই ছিল প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার। কলকাতার রাজপথ থেকে শুরু করে গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এই স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে।5
- সর্বভারতীয় স্তরে প্রচার (লাল-বাল-পাল): বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন মূলত বাংলায় শুরু হলেও, জাতীয়তাবাদী ত্রয়ী—লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক এবং বিপিন চন্দ্র পাল—এই মন্ত্রটিকে সারা ভারতে ছড়িয়ে দেন। বাল গঙ্গাধর তিলক গানটিকে মারাঠা অঞ্চলে পৌঁছে দেন এবং এটিকে জাতীয় সংহতির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। বিপিন চন্দ্র পালের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বন্দে মাতরম্’ পত্রিকা এই আদর্শকে ভারতের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলে।
- বারাণসী অধিবেশন (১৯০৫) ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি: ১৯০৫ সালে বারাণসীতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে সরলা দেবী চৌধুরানী ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি পরিবেশন করেন। যদিও কংগ্রেসের ভেতর নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে মতভেদ ছিল, তবুও এই গানটি উভয় পক্ষকেই এক সূত্রে বেঁধেছিল। এই সময় থেকেই কংগ্রেসের প্রতিটি সভা ও মিছিলের শুরুতে ‘বন্দে মাতরম্’ বলা বাধ্যতামূলক প্রথায় পরিণত হতে থাকে।
- বরিশাল কনফারেন্স (১৯০৬) ও রাজদ্রোহের প্রতীক: ১৯০৬ সালের বরিশাল প্রাদেশিক সম্মেলনে এই গানটি ঘিরে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়। ব্রিটিশ সরকার ‘বন্দে মাতরম্’ স্লোগান দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু জাতীয়তাবাদী নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্যান্য প্রতিনিধিরা সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বুক ফুলিয়ে এই ধ্বনি দিতে দিতে মিছিল করেন। পুলিশের লাঠিচার্জ সত্ত্বেও নেতারা পিছু হটেননি। এই ঘটনার পর ‘বন্দে মাতরম্’ ব্রিটিশ বিরোধী রাজদ্রোহের (Sedition) সমার্থক হয়ে ওঠে।
- অরবিন্দ ঘোষের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা: শ্রী অরবিন্দ ঘোষ এই সময় রাজনীতির আঙিনায় পদার্পণ করেন। তিনি ব্যাখা করেন যে, ‘বন্দে মাতরম্’ কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি হলো দেশমাতৃকার এক নতুন সত্তা। তিনি বলতেন, বঙ্কিমচন্দ্র এই গানের মাধ্যমে ভারতকে কেবল একটি মানচিত্র নয়, বরং একটি জীবন্ত ‘মা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই ব্যাখ্যা জাতীয় কংগ্রেসের তরুণ কর্মীদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি করেছিল।
- ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা ও জনমানসে প্রভাব: তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ‘বন্দে মাতরম্’ নিষিদ্ধ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এর প্রতি আকর্ষণ আরও বেড়ে যায়। জাতীয়তাবাদী নেতারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, ব্রিটিশরা এই গানটিকে ভয় পায়। ফলে তাঁরা এই গানটিকে প্রতিবাদের ভাষার পাশাপাশি ‘জাতীয় সঙ্গীত’-এর মর্যাদায় আসীন করেন। ১৯০৬ সালের কলকাতা অধিবেশনে কংগ্রেসের মঞ্চে এই গানের জয়জয়কার পুরো ভারতবর্ষের মুক্তি সংগ্রামের ছবিটা বদলে দিয়েছিল।
- গান্ধীজির ভূমিকা: গান্ধীজি ‘বন্দে মাতরম্’ গানটিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং এটিকে একতার এক শক্তিশালী মন্ত্র হিসেবে দেখতেন। অসহযোগ ও লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় গান্ধীজির নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে এই স্লোগান দিয়ে কারাবরণ করেছেন। গান্ধীজি তাঁর প্রার্থনাসভায় প্রায়ই এই গানটি ব্যবহার করতেন।
- সুভাষচন্দ্র বসু ও ‘বন্দে মাতরম্’: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন এই গানের এবং এর অন্তর্নিহিত বৈপ্লবিক শক্তির পরম ভক্ত। তিনি যখন কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি এই গানটির মর্যাদা রক্ষায় অনড় ছিলেন। তিনি মনে করতেন ভারতের মুক্তি সংগ্রামের প্রাণশক্তি হলো ‘বন্দে মাতরম্’। আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে তিনি এই গানটিকে তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যে দেশপ্রেম জাগানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর নির্দেশে সিঙ্গাপুরে ও রেঙ্গুনে আজাদ হিন্দ রেডিও থেকে নিয়মিত এই গানটি বাজানো হতো।
- বিপ্লবী আন্দোলনে ভূমিকা: অরবিন্দ ঘোষ এই গানটিকে ‘জাতীয়তাবাদের পবিত্র মন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন।6 ক্ষুদিরাম বসু থেকে শুরু করে মাস্টারদা সূর্য সেন, ভগৎ সিং—বিপ্লবীরা ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময়ও অকুতোভয় চিত্তে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারণ করতেন।
- দেশভাগ পরবর্তী ভূমিকা: দেশভাগের পরে উদ্বাস্তু সমস্যা-র সময়েও এই গান মানুষের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে।
ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া ও দমননীতি
ব্রিটিশ সরকার এই গানকে অত্যন্ত বিপজ্জনক মনে করত কারণ এটি জনগণের মধ্যে রাজদ্রোহিতার আগুন জ্বালিয়ে দিত। ফলে তারা জনসমক্ষে এই গান গাওয়া বা স্লোগান দেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।7 ১৯০৬ সালে বরিশালে এক রাজনৈতিক সম্মেলনে ব্রিটিশ পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর অমানবিক লাঠিচার্জ করে শুধুমাত্র এই স্লোগান দেওয়ার অপরাধে। বহু দেশপ্রেমিককে এই গান গাওয়ার জন্য কারাদণ্ড ও বেত্রাঘাত সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু এই দমননীতি গানটির জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
জাতীয় সংগীত বনাম জাতীয় স্তোত্র: সাংবিধানিক স্বীকৃতি
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ‘বন্দে মাতরম্’ গানটিকে জাতীয় সংগীত করার দাবি ওঠে। তবে গানটির কিছু অংশ অত্যন্ত কঠিন সংস্কৃত এবং এতে দেবী মূর্তির উপমা থাকায় সব ধর্মাবলম্বীদের কথা মাথায় রেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জনগণমন’ গানটিকে ‘জাতীয় সংগীত’ (National Anthem) করা হয়।তবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এর ঐতিহাসিক ও আবেগগত গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ঘোষণা করেন যে— ‘বন্দে মাতরম্’ ভারতের ‘জাতীয় গান’ বা ‘জাতীয় স্তোত্র’ (National Song) হিসেবে স্বীকৃত হবে এবং এটি ‘জনগণমন’-এর সমান মর্যাদা পাবে।
বিতর্ক ও আধুনিক মূল্যায়ন
সময়ের সাথে সাথে এই গানটি নিয়ে কিছু বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-র সময়েও এই গান নিয়ে বিতর্ক ওঠে। কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী মনে করেন গানটিতে মূর্তিপূজার আবহ আছে যা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ও জাতীয়তাবাদীদের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গান নয়, বরং এটি দেশপ্রেমের এক কাব্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক। এখানে ‘দেবী’ শব্দটিকে ভারতবর্ষের এক রূপক সত্তা হিসেবে দেখা হয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম্’ ছিল পরাধীন ভারতের ঘুমন্ত জাতীয় চেতনাকে জাগিয়ে তোলার শঙ্খনাদ। এটি কেবল শব্দসমষ্টি নয়, এটি ছিল কোটি কোটি ভারতবাসীর সাহস এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার অমর প্রকাশ। আজ দেড়শ বছর পরেও এই গানটি ভারতবাসীর মনে দেশপ্রেমের চিরন্তন প্রতীক হিসেবে বিরাজমান।8
গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য ও কালপঞ্জি
- ১৮৯৬ সাল: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে গানটি গাওয়া হয়। গানটি গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
- ১৯০৫ সাল: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় ‘বন্দে মাতরম’ সাধারণ মানুষের স্লোগানে পরিণত হয়।
- ১৯০৭ সাল: মাদাম ভিকাজি কামা যখন জার্মানির স্টুটগার্টে প্রথমবার ভারতের ‘তীরঙ্গা’ পতাকা উত্তোলন করেন, তখন সেই পতাকায় ‘বন্দে মাতরম’ লেখা ছিল।
- ১৯৫০ সাল: ২৪শে জানুয়ারি ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ‘বন্দে মাতরম’ গানটিকে ভারতের জাতীয় গান (National Song) হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
- যদুনাথ ভট্টাচার্য — যাঁর সুরে গানটি আরও জনপ্রিয়তা পায়।
- বিষ্ণু দিগম্বর পালুস্কর — তাঁর শাস্ত্রীয় ধাঁচের সুরারোপ দেশব্যাপী সমাদৃত হয়।
‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীত ও স্তোত্র সম্পর্কে আরও জানতে উইকিপিডিয়া থেকে পড়ুন
————– বন্দেমাতরম সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর —————
Section A- QUIZ: মক টেস্ট দিয়ে নিজেকে যাচাই করুন
বন্দে মাতরম্: ইন্টারঅ্যাক্টিভ কুইজ
সঠিক উত্তরে মিষ্টি শব্দ, ভুল উত্তরে বুজ শব্দ, ব্যাখ্যাসহ ফলাফল।
Section B-Basic MCQ: নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন
Section C-Advanced MCQ: নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন
বন্দে মাতরম্ : উন্নতমানের প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন পড়ুন, অপশন দেখুন, তারপর উত্তরটি reveal করুন
Section D-FAQ: বন্দেমাতরম সংক্রান্ত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
‘বন্দে মাতরম্’ গানটি কে রচনা করেন?
উত্তর: বিখ্যাত সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে (১৮৭৫ নাগাদ) এই গানটি রচনা করেন।
‘বন্দে মাতরম্’ গানটি প্রথম কোন উপন্যাসে প্রকাশিত হয়?
উত্তর: এটি ১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উপন্যাস 'আনন্দমঠ'-এ প্রথম প্রকাশিত হয়।
‘বন্দে মাতরম্’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ কী?
উত্তর: ‘বন্দে মাতরম্’ একটি সংস্কৃত শব্দবন্ধ, যার বাংলা অর্থ হলো— “মা (মাতৃভূমি), আমি তোমার বন্দনা করি” বা “তোমায় প্রণাম করি মা”।
‘বন্দে মাতরম্’ কোন ভাষায় লেখা?
উত্তর: গানটি মূলত সংস্কৃত ভাষায় লেখা, তবে এতে প্রচুর বাংলা শব্দের ব্যবহার রয়েছে (যাকে অনেকে মিশ্র ভাষা বলেন)।
ভারতের ‘জাতীয় সংগীত’ (National Anthem) এবং ‘জাতীয় গান’ (National Song)-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: ভারতের জাতীয় সংগীত হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জন গণ মন’, আর ‘বন্দে মাতরম্’ হলো ভারতের জাতীয় গান (National Song)। মর্যাদার দিক থেকে দুটিই সমান।
‘বন্দে মাতরম্’ গানটিতে প্রথম কে সুর দিয়েছিলেন?
উত্তর: গানটির মূল সুর দিয়েছিলেন যদুনাথ ভট্টাচার্য। তবে বর্তমানে প্রচলিত সুরটির পেছনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় অবদান রয়েছে।
প্রথম কবে এবং কোথায় প্রকাশ্যে এই গানটি গাওয়া হয়েছিল?
উত্তর: ১৮৯৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমবার জনসমক্ষে ‘বন্দে মাতরম্’ গেয়েছিলেন।
‘বন্দে মাতরম্’ গানটি প্রথম কে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন?
উত্তর: বিপ্লবী ও ঋষি শ্রী অরবিন্দ ঘোষ ১৯০৯ সালে প্রথম এই গানটির ইংরেজি গদ্যানুবাদ (Mother, I bow to thee!) করেন।
ব্রিটিশ সরকার কেন ‘বন্দে মাতরম্’ স্লোগানটি নিষিদ্ধ করেছিল?
উত্তর: ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে এই স্লোগানটি বিপ্লবীদের মূল মন্ত্রে পরিণত হয়। ব্রিটিশ সরকার জাতীয়তাবাদের এই জাগরণ দমাতে এটি নিষিদ্ধ করে।
ভারতের ‘জাতীয় গান’ হিসেবে এটি কবে স্বীকৃতি পায়?
উত্তর: ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ‘বন্দে মাতরম্’-কে ভারতের জাতীয় গান (National Song) হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন।
‘বন্দে মাতরম্’ গানটি কোন আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত?
উত্তর: এটি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ভারতের সামগ্রিক স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল।
বর্তমানে ভারতের জাতীয় গান হিসেবে এই গানের কতটুকু অংশ গাওয়া হয়?
উত্তর: মূল গানটি অনেক বড় হলেও সরকারিভাবে ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুটি স্তবক জাতীয় গান হিসেবে গাওয়ার নিয়ম রয়েছে।
‘বন্দে মাতরম্’ গানটির সঙ্গে ‘ভারতমাতা’ চিত্রের সম্পর্ক কী?
উত্তর: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি মূলত ‘বন্দে মাতরম্’ গানের ভাবধারা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
আধুনিক যুগে ‘বন্দে মাতরম্’-এর সবচেয়ে জনপ্রিয় সুরকার কে?
উত্তর: ভারতের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে এ. আর. রহমান-এর ‘মা তুঝে সালাম’ অ্যালবামের মাধ্যমে গানটি আধুনিক প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে জনপ্রিয়তা পায়।
-------------- আরও পড়ুন ---------------
সূত্রনির্দেশ:
- Sabyasachi Bhattacharya, Vande Mataram: The Biography of a Song, Penguin, 2003, p. 12. ↩︎
- Bankim Chandra Chattopadhyay, Anandamath, 1882, Chapter 1–2. ↩︎
- Meenakshi Mukherjee, Early Novels in India, Sahitya Akademi, 2002, p. 78. ↩︎
- Bipan Chandra et al., India’s Struggle for Independence, Penguin, 1989, p. 112. ↩︎
- Bipan Chandra, Modern India, NCERT, p. 210. ↩︎
- Bhabatosh Chatterjee (ed.), Bankim Chandra Essays, Sahitya Akademi, p. 601. ↩︎
- S.N. Sen, History of the Freedom Movement in India, p. 156. ↩︎
- Sabyasachi Bhattacharya, Vande Mataram, p. 45. ↩︎

Pingback: All History Posts - Subhas Biswas – Lekhapora