উনিশ শতকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষের কারণগুলি কী ছিল?

ভুমিকা: উনিশ শতকের ভারত ইতিহাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ। ব্রিটিশ শাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ফল হিসেবেই এই জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। সাধারণত 1858 থেকে 1885 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে ভারতে জাতীয়তাবাদের বিকাশ কাল বলা হয়। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, উনিশ শতকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারক ও বাহক ছিল। ইতিহাসবিদ বিপান চন্দ্র তাঁর ‘মডার্ন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ভারতীয় ও ব্রিটিশ স্বার্থের সংঘাতই ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষের মূল কারণ।”

1. ব্রিটিশ দমননীতি: ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন সময়ে দমননীতি প্রয়োগের দ্বারা ভারতীয়দের স্বাধীনতা খর্ব করতে চেয়েছিল। লর্ড ওয়েলেসলি প্রবর্তিত অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি, ডালহৌসি প্রবর্তিত স্বত্ববিলোপ নীতি, লর্ড আমহার্স্ট প্রবর্তিত জুরি আইন, লর্ড পিট প্রবর্তিত ভারত শাসন আইন, লর্ড কার্জন প্রবর্তিত মিউনিসিপ্যালিটি আইন ইত্যাদির আঘাত ভারতবাসীর মনে জাতীয়তাবাদের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। ব্রিটিশ শাসনের এইসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভারতীয়দের মধ্যে এক ঐক্যবোধ জাগ্রত হয়। এই ঐক্যবোধ থেকেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়।

2. বর্ণগত বৈষম্য ও জাতিগত বিদ্বেষ: জাতিগত দিক থেকে ব্রিটিশ শাসকরা ভারতীয়দের তুলনায় নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে মনে করতেন। ভারতীয়রা তাদের কাছে ছিল ঘৃণ্য ও বর্বর। বেশির ভাগ সরকারি উচ্চপদ, উচ্চশ্রেণীর প্রতিক্ষালয়, রেল কামরা প্রভৃতিতে ইউরোপীয়দের জন্য আসন সংরক্ষিত থাকত। পদস্থ ভারতীয়দের লাঞ্ছিত করতে তারা কোনো দ্বিধাবোধ করতো না। ভারতীয়দের ওপর ব্রিটিশদের এই লাঞ্ছনা এবং সীমাহীন ঔদ্ধত্য শিক্ষিত ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনোও ভারতীয়র পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। এই অপমানবোধ তাদের জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত করে তোলে।

3. অর্থনৈতিক শোষণ: ব্রিটিশ সরকারের অপশাসন, দেশীয় শিল্পের ধ্বংসসাধন, বৈষম্যমূলক করভার ক্রমশ ভারতীয় অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। কৃষকদের ওপর সরকারি করের বোঝা, জমিদার ও মহাজনদের শোষণ ভারতীয়দের চরম দুর্দশায় ঠেলে দেয়। ইংল্যান্ড-জাত দ্রব্য ভারতে বিনা শুল্কে আমদানি এবং ভারতীয় দ্রব্যের ওপর চাপানো হয় বিশাল করের বোঝা। এই অসম প্রতিযোতিতার ফলে ভারতীয় কুটির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করে সংঘবদ্ধভাবে নিজেদের দাবিদাওয়া আদায় করতে চেষ্টা করলে সরকার কঠোর হাতে তা দমন করতেন। সুতরাং কৃষক, কারিগর ও শ্রমিক—এই তিন শ্রেণির মানুষ ক্রমেই অনুভব করতে থাকে যে, তাদের রাজনৈতিক অধিকার বলতে কিছু নেই এবং বিদেশি পুঁজিপতিরা তাদের শোষণ করতেই সর্বদা সচেষ্ট।

4. ভারতীয়দের বেকারত্ব জ্বালা: ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ভারতের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যেতে থাকে। মহারানী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্রে (1858 খ্রি.) যোগ্য ভারতীয়দের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, সরকার এই প্রতিশ্রুতি পালন করার পরিবর্তে তা ভাঙতেই বেশি তৎপর হয়ে ওঠেন। ক্রমশ শিক্ষিতদের পক্ষে সরকারি চাকুরি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে সরকারের উচ্চ ও দায়িত্বশীল পদগুলি ইউরোপীয়দের জন্যই সংরক্ষিত রাখা হত এবং কিছু কিছু নিম্নপদে ভারতীয়দের নিয়োগ করা হত। এই সব বিভিন্ন কারণে শিক্ষিত ভারতীয়দের মনে এক তীব্র বিক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং তারা এই ধারণায় বদ্ধমূল হয় যে, বিদেশি শাসনের অবসান ঘটাতে পারলেই ভারতের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি সম্ভব।

5. ভারতীয় সংস্কৃতির পুনঃজাগরণ: পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব এদেশের সাহিত্যের ওপর পড়লেও তা বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষণা এবং রামমোহন, দয়ানন্দ, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নব্য-হিন্দুধর্ম প্রচারের ফলে ভারত ও বিশ্ববাসী ভারতের সুপ্রাচীন ও মহত্তর সভ্যতা সম্পর্কে জানতে সমর্থ হয়। এক্ষেত্রে 1884 খ্রি. উইলিয়াম জোন্স কর্তৃক এশিয়াটিক সোসাইটি-র প্রতিষ্ঠা এবং ম্যাক্স মুলার, মনিয়র উইলিয়মস্, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামকৃষ্ণ গোপাল ভাণ্ডারকর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এর ফলে ভারতে এক সাংস্কৃতিক নবজাগরণ দেখা দেয় এবং তা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গঠনে সাহায্য করে। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, “ভারতীয় সংস্কৃতির পুনঃসংস্কারের ওপর ভিত্তি করে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়।”

6. জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন সাহিত্য: জাতীয়তাবাদের অগ্রগতিতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রকাশিত সাহিত্যগুলির অবদান অনস্বীকার্য। কবি, সাহিত্যিক ও প্রবন্ধকারগণ তাঁদের রচনার মাধ্যমে দেশবাসীর অন্তরে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, নবীনচন্দ্র সেন দেশবাসীকে জাতীয়তাবোধের নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস দেশবাসীকে জাতীয়তাবাদের নতুন মন্ত্রে দীক্ষিত করে। স্বামী বিবেকানন্দের রচনা দেশবাসীকে আত্মদান, আত্মত্যাগ, আত্ম-বিশ্বাস ও জাতীয়তার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করে ভারতে এক নবযুগের সৃষ্টি করে। হিন্দি, মারাঠি, তামিল, তেলুগু, গুজরাটি, ওড়িয়া, অসমীয়া এবং উর্দু সাহিত্যেও যুগান্তর আসে।

7. ভারতীয় স্বার্থের প্রতি উদাসীন মনোভাব: পাশ্চাত্য শিক্ষা ও রাজনৈতিক দর্শনের ছোঁয়ায় ভারতীয়রা উপলব্ধি করে যে, প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থাই সর্বশ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। মহাবিদ্রোহের পর প্রশাসনিক পরিবর্তন করা হলেও, তা ভারতীয়দের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে সেইসব ভারতীয়দের মনোনীত করা হয়, যারা ইংরেজদের অনুগত ছিলেন। প্রাদেশিক আইন পরিষদগুলিতেও ভারতীয়দের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। এছাড়া, ভারত শাসন পরিচালনার অত্যধিক ব্যয়, ভারত সরকারের নামে গৃহীত ঋণের সুদ, ইংরেজ স্বার্থে পরিচালিত বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ব্যয়ভার, সেনাবাহিনীর জন্য বিপুল ব্যয় এবং অপরদিকে ভারতীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেচ, শিল্পোন্নয়ন প্রভৃতির প্রতি চরম অবহেলা মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

8. সংবাদপত্রের অবদান: ভারতীয় জাতীয় জাগরণের ইতিহাসে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। সিপাহি বিদ্রোহের পরবর্তীকালে ভারতীয় মালিকানাধীন সংবাদপত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ভারতবাসীর রাজনৈতিক শিক্ষা, দেশাত্মবোধ ও জাতীয় চেতনা বৃদ্ধিতে সংবাদপত্রগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্রে সরকারি অনাচার, ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক শোষণ, ভারতবাসীর দুর্দশা ও ভারতীয়দের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং সরকারের বিভিন্ন ভ্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মতামত প্রকাশিত হতে থাকে। এক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষায় হিন্দু প্যাট্রিয়ট, বেঙ্গলি, অমৃতবাজার, ইন্ডিয়ান মিরর এবং বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সোমপ্রকাশ’, বঙ্গবাসী’, সঞ্জীবনী’ প্রভৃতির ভূমিকা অনস্বীকার্য।

উপসংহার: পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব, ব্রিটিশ শোষণের নগ্নরূপ সম্পর্কে সর্বস্তরের ভারতবাসীর চেতনা, ইউরোপ ও আমেরিকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দৃষ্টান্ত ইত্যাদি ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটায়। বিভিন্ন দুর্বলতা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্তর্নিহিত প্রকৃতি এবং ভারতীয়দের মধ্যে তার ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। জাতীয়তাবাদের এই চেতনাই পরবর্তী দিনে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top