ভূমিকা:
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় ২৫শে জুন একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এই দিনটিকে ‘সংবিধান হত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু কেন এই দিনটি এত বিতর্কিত? আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগে, ১৯৭৫ সালের এই দিনেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী দেশে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি’ বা জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। আগামী দুই বছর ভারত যা প্রত্যক্ষ করেছিল, তা ছিল আধুনিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়।

১. জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপট: ১৯৭১-এর নির্বাচন ও আইনি লড়াই
জরুরি অবস্থার সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ইন্দিরা গান্ধী সেই নির্বাচনে রায়বরেলি কেন্দ্র থেকে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন। কিন্তু তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনারায়ণ এলাহাবাদ হাইকোর্টে ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে মামলা করেন।
১৯৭৫ সালের ১২ই জুন এলাহাবাদ হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং পরবর্তী ৬ বছরের জন্য তাঁর নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে। সুপ্রিম কোর্ট শর্তসাপেক্ষে তাঁকে ক্ষমতায় থাকার অনুমতি দিলেও, সংসদীয় কার্যক্রমে তাঁর ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এই আইনি রায়ই মূলত ইন্দিরা গান্ধীকে কোণঠাসা করে ফেলে।
২. জয়প্রকাশ নারায়ণ ও ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ (Total Revolution)
আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি দেশজুড়ে তখন প্রবল গণ-অসন্তোষ। বেকারত্ব, চরম দারিদ্র্য এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে প্রবীণ জননেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ (JP) ‘টোটাল রেভোলিউশন’ বা সম্পূর্ণ বিপ্লবের ডাক দেন। দিল্লির রামলীলা ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত সরকারকে বিচলিত করে তোলে। ইন্দিরা গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিপন্ন।
৩. মধ্যরাতের ঘোষণা: নাগরিকদের স্বাধীনতা হরণ
১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন মধ্যরাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ জরুরি অবস্থার নথিতে স্বাক্ষর করেন। পরদিন সকালে আকাশবাণী রেডিওর মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী দেশবাসীকে জানান, “মাননীয় রাষ্ট্রপতি দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।” ভারতীয় সংবিধানের ৩৫২ নম্বর ধারা অনুসারে এই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।1 এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতীয় নাগরিকদের সমস্ত মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) কেড়ে নেওয়া হয় এবং সংবাদপত্রের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়।
৪. রাজনৈতিক বন্দি ও জেলের অন্ধকার ইতিহাস
জরুরি অবস্থা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধীদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে শুরু হয় গণ-গ্রেপ্তার। অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদভানি, মোরারজি দেশাই এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো শীর্ষ নেতাদের জেলে বন্দি করা হয়। ‘মিশা’ (MISA) আইনের অপপ্রয়োগ করে বিনা বিচারে হাজার হাজার মানুষকে আটক রাখা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও বই (যেমন: Torture of Political Prisoners in India) থেকে জানা যায়, জেলে বন্দিদের ওপর অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো।
৫. জোরপূর্বক নাসবন্দী বা স্টেরিলাইজেশন
জরুরি অবস্থার অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় ছিল সঞ্জয় গান্ধীর নেতৃত্বে চালানো ‘জোরপূর্বক নাসবন্দী’ কর্মসূচি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে গ্রামের সাধারণ মানুষ, এমনকি অবিবাহিত যুবকদেরও রাস্তা থেকে ধরে এনে জোর করে অপারেশন করানো হতো। টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে করা এই অপারেশনের ফলে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।
৬. তুর্কমান গেট হত্যাকাণ্ড ও মিডিয়া সেন্সরশিপ
১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লির তুর্কমান গেট এলাকায় অবৈধ বস্তি উচ্ছেদের প্রতিবাদ করায় পুলিশের গুলিতে বহু মানুষ নিহত হন। এই নৃশংস ঘটনার কোনো খবরই তৎকালীন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করতে দেওয়া হয়নি। গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। এমনকি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বিখ্যাত গায়ক কিশোর কুমারের গান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল কারণ তিনি সরকারি অনুষ্ঠানে গাইতে রাজি হননি।
৭. সংবিধানের ম্যানিপুলেশন ও ৪২তম সংশোধনী
জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধী সংবিধানের ৪২তম সংশোধনী পাস করেন, যা ভারতের সংবিধানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে পরিচিত। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কমিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছিল।
৮. উপসংহার:
১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয় এবং সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের সেই ২১ মাস ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক বিরাট আঘাত ছিল। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই ইতিহাসকে স্মরণ করার অর্থ হলো গণতন্ত্রের মূল্য এবং নাগরিক অধিকারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন থাকা। গণতন্ত্র কেবল সরকার গঠন নয়, বরং সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা ও বিরোধিতার অধিকারকেও স্বীকৃতি দেওয়া।
নিজেকে যাচাই করতে নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন
১. ভারতে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা কত তারিখে ঘোষণা করা হয়েছিল?
ক) ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
খ) ২৬ জানুয়ারি ১৯৭৫
গ) ২৫ জুন ১৯৭৫
ঘ) ৩০ মে ১৯৭৫
উত্তর: গ) ২৫ জুন ১৯৭৫
২. জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?
ক) মোরারজি দেশাই
খ) ইন্দিরা গান্ধী
গ) লাল বাহাদুর শাস্ত্রী
ঘ) রাজীব গান্ধী
উত্তর: খ) ইন্দিরা গান্ধী
৩. কোন রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়?
ক) ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
খ) ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ
গ) ভি. ভি. গিরি
ঘ) নীলম সঞ্জীব রেড্ডি
উত্তর: খ) ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ
৪. ভারতীয় সংবিধানের কত নম্বর ধারা অনুযায়ী এই জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল?
ক) ৩৫২ নম্বর ধারা
খ) ৩৫৬ নম্বর ধারা
গ) ৩৬০ নম্বর ধারা
ঘ) ৩৭০ নম্বর ধারা
উত্তর: ক) ৩৫২ নম্বর ধারা (অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে)
৫. ১৯৭৫ সালের এই জরুরি অবস্থা কত মাস স্থায়ী হয়েছিল?
ক) ১২ মাস
খ) ১৮ মাস
গ) ২১ মাস
ঘ) ২৪ মাস
উত্তর: গ) ২১ মাস (১৯৭৭ সালের মার্চ পর্যন্ত)
৬. জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ (Total Revolution)-এর ডাক দিয়েছিলেন কে?
ক) জ্যোতি বসু
খ) জয়প্রকাশ নারায়ণ
গ) অটল বিহারী বাজপেয়ী
ঘ) চরণ সিং
উত্তর: খ) জয়প্রকাশ নারায়ণ
৭. জরুরি অবস্থার সময় সংবাদপত্রের ওপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জারি ছিল?
ক) ফ্রি প্রেস
খ) সেন্সরশিপ
গ) ইয়েলো জার্নালিজম
ঘ) কোনোটিই নয়
উত্তর: খ) সেন্সরশিপ (Censorship)
৮. জরুরি অবস্থার সময় বলপূর্বক কোন কর্মসূচি পালনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উঠেছিল?
ক) বৃক্ষরোপণ
খ) গণ নির্বীজকরণ বা বন্ধ্যাকরণ (Sterilization)
গ) নিরক্ষরতা দূরীকরণ
ঘ) শিল্পায়ন
উত্তর: খ) গণ নির্বীজকরণ বা বন্ধ্যাকরণ
৯. জরুরি অবস্থা পরবর্তী ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দল জয়লাভ করে?
ক) ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস
খ) জনতা পার্টি
গ) সিপিআই (এম)
ঘ) বিজেপি
উত্তর: খ) জনতা পার্টি
১০. ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থাকে ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে কী বলা হয়?
ক) স্বর্ণযুগ
খ) কালো অধ্যায়
গ) বিপ্লবের যুগ
ঘ) উন্নয়নের সময়
উত্তর: খ) কালো অধ্যায় (Dark Chapter)
প্রয়োজনীয় কিছু FAQ (সাধারণ জিজ্ঞাসা)
১. ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা কেন জারি করা হয়েছিল?
উত্তর: ইন্দিরা গান্ধী সরকারের দাবি ছিল যে, বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এলাহাবাদ হাইকোর্ট কর্তৃক ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করার পর নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
২. জরুরি অবস্থার সময় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের কী হয়েছিল?
উত্তর: জরুরি অবস্থা চলাকালীন নাগরিকদের সমস্ত মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়েছিল। বিনা বিচারে যে কাউকে গ্রেপ্তার করা যেত (MISA আইনের অধীনে) এবং আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
৩. সংবাদপত্রের সেন্সরশিপ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: এর অর্থ হলো, যেকোনো খবর বা লেখা প্রকাশের আগে সরকারের অনুমতি নিতে হতো। সরকারের সমালোচনা করে এমন কোনো সংবাদ বা সম্পাদকীয় প্রকাশ নিষিদ্ধ ছিল। এর প্রতিবাদে অনেক সংবাদপত্র তাদের সম্পাদকীয় কলাম ফাঁকা রেখে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
৪. জয়প্রকাশ নারায়ণ (JP)-এর ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: জয়প্রকাশ নারায়ণ ছিলেন জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেতা। তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ বা জেপি আন্দোলন ইন্দিরা গান্ধী সরকারের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তাঁকে কারারুদ্ধ করা হলেও কারাগার থেকেই তিনি আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে ছিলেন।
৫. এই জরুরি অবস্থার অবসান কীভাবে ঘটেছিল?
উত্তর: ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা শিথিল করার এবং নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসে। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি অবস্থার অবসান ঘটে।
৬. জরুরি অবস্থার রাজনৈতিক প্রভাব কী ছিল?
উত্তর: এটি ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার কেন্দ্রে অ-কংগ্রেসি সরকার (জনতা পার্টি) গঠনের পথ প্রশস্ত করে এবং ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
উত্তর: এটি ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার কেন্দ্রে অ-কংগ্রেসি সরকার (জনতা পার্টি) গঠনের পথ প্রশস্ত করে এবং ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- Constitution of India, Article 352 / Shah Commission Report (1978). ↩︎
