শহিদ ভগত সিং: বীরত্ব, আত্মত্যাগ এবং বিপ্লবের এক অগ্নিপুরুষের আখ্যান

১. ভূমিকা:

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায় যে কটি নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তাদের মধ্যে ‘শহিদ-ই-আজম’ ভগত সিং অন্যতম। তিনি কেবল একজন সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন প্রখর চিন্তাবিদ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ধারক। মাত্র ২৩ বছরের স্বল্প জীবনে তিনি যেভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, তা আজও আমাদের শিহরিত করে। আজকের এই ব্লগে আমরা তাঁর জীবন, সংগ্রাম এবং আদর্শের গভীরতা বিশ্লেষণ করব।

২. প্রাথমিক জীবন ও দেশপ্রেমের অঙ্কুরোদগম

১৯০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর (মতান্তরে ২৮ সেপ্টেম্বর) অবিভক্ত পাঞ্জাবের লয়ালপুর জেলার বঙ্গে এক শিখ পরিবারে ভগত সিং জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল আদ্যোপান্ত বিপ্লবী চেতনায় সমৃদ্ধ। বাবা কিশন সিং এবং কাকা অজিত সিং দুজনেই ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় সৈনিক।

শৈশব থেকেই ভগত সিং-এর মধ্যে এক অদম্য দেশপ্রেম লক্ষ্য করা যেত। একটি জনপ্রিয় লোকগাথা অনুযায়ী, শৈশবে তিনি জমিতে বন্দুক পুঁতে রাখতেন যাতে ‘বন্দুকের গাছ’ জন্মায় এবং তা দিয়ে ব্রিটিশদের তাড়ানো যায়। পরিবারের বড়দের জেল খাটা এবং আত্মত্যাগ তাঁর কচি মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

৩. জালিওয়ানওয়ালা বাগ: বিপ্লবের প্রকৃত সূচনা

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিওয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড ভগত সিং-এর জীবনকে আমূল বদলে দেয়। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে তিনি পায়ে হেঁটে অমৃতসর পৌঁছান এবং শহিদদের রক্তে ভেজা মাটি একটি বোতলে ভরে নিয়ে আসেন। সেই রক্তমাখা মাটিই ছিল তাঁর বিপ্লবের প্রথম দীক্ষা।

আরও পড়ুন: জালিওয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ফলাফল

৪. মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ ও মোহভঙ্গ

শুরুতে ভগত সিং মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে আস্থাশীল ছিলেন। ১৯২১ সালে গান্ধীজির ডাকে তিনি স্কুল ত্যাগ করেন এবং বিদেশি বস্ত্র পোড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। কিন্তু ১৯২২ সালের ‘চৌরিচৌরা’ ঘটনার পর গান্ধীজি হঠাৎ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে তরুণ ভগত সিং-এর মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তিনি বুঝতে পারেন, কেবল অহিংসার মাধ্যমে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

৫. হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA)

১৯২৪ সালে তিনি শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ও যোগেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’-এ যোগ দেন। পরবর্তীকালে চন্দ্রশেখর আজাদের সাথে মিলে তিনি এর নামকরণ করেন ‘হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ (HSRA)। এখান থেকেই তাঁর বৈপ্লবিক ভাবধারা সমাজতান্ত্রিক দিকে মোড় নেয়। তিনি কেবল ব্রিটিশ বিতাড়ন নয়, বরং কৃষক ও শ্রমিকের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

৬. লালা লাজপত রায়ের মৃত্যু ও স্যান্ডার্স হত্যাকাণ্ড

১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী মিছিলে পুলিশি লাঠিচার্জে বর্ষীয়ান নেতা লালা লাজপত রায়ের মৃত্যু হলে সারা ভারত স্তম্ভিত হয়ে যায়। এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেব ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার জেমস স্কটকে মারার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ভুলবশত তাঁরা জন স্যান্ডার্সকে গুলি করে হত্যা করেন। এই ঘটনা ব্রিটিশ শাসনের গালে ছিল এক চপেটাঘাত।

৭. দিল্লির সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ

ব্রিটিশদের দমনমূলক ‘পাবলিক সেফটি বিল’ এবং ‘ট্রেড ডিসপিউটস বিল’-এর প্রতিবাদে ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লির সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা ছিল না, বরং ‘বধির ব্রিটিশ সরকারকে শোনানো’ ছিল মূল লক্ষ্য। তাঁরা সেখানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন এবং স্বেচ্ছায় ধরা দেন।

আরও পড়ুন: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদের গুরুত্ব

৮. জেল জীবন ও ঐতিহাসিক অনশন

জেলে থাকাকালীন ভগত সিং ভারতীয় কয়েদিদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তিনি এবং যতীন দাস রাজনৈতিক বন্দিদের মর্যাদার দাবিতে টানা অনশন শুরু করেন। ৬৩ দিন অনশনের পর যতীন দাস শহিদ হন, কিন্তু ভগত সিং তাঁর সংগ্রাম চালিয়ে যান। এই সময় তিনি প্রচুর বই পড়েন এবং তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Why I am an Atheist’ (আমি কেন নাস্তিক) রচনা করেন।

৯. চূড়ান্ত আত্মত্যাগ: ২৩শে মার্চ ১৯৩১

স্যান্ডার্স হত্যা মামলায় (লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা) ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ২৪ মার্চ ফাঁসির দিন ধার্য থাকলেও ব্রিটিশ সরকার গণ-অভ্যুত্থানের ভয়ে ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় গোপনে তাঁদের ফাঁসি কার্যকর করে। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তিনি লেনিনের জীবনী পড়ছিলেন। বীরের মতো হাসি মুখে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে ওঠেন।1

পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য (Quick Facts)

  • জন্ম: ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯০৭।
  • বিপ্লবী সংগঠন: নওজোয়ান ভারত সভা (১৯২৬), HSRA (১৯২৮)।
  • বিখ্যাত স্লোগান: ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
  • ফাঁসির তারিখ: ২৩ মার্চ, ১৯৩১ (লাহোর সেন্ট্রাল জেল)।
  • সহযোগী: রাজগুরু, সুখদেব, চন্দ্রশেখর আজাদ, বটুকেশ্বর দত্ত।

১০. উপসংহার

শহিদ ভগত সিং কেবল এক ঐতিহাসিক চরিত্র নন, তিনি এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা। তাঁর সমাজতান্ত্রিক দর্শন এবং দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জনের মানসিকতা আমাদের শেখায় যে, আদর্শের জন্য লড়াই করাই প্রকৃত জীবন। আজকের ছাত্রসমাজ ও যুবসমাজের কাছে তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এক একটি আদর্শের পাঠশালা।


এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলে শেয়ার করুন এবং কমেন্টে জানান আপনি ভগত সিং-এর কোন আদর্শে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত।

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে নিয়মিত ইতিহাসের বিভিন্ন লেখালিখি এবং আপডেট পেতে এখানে ক্লিক করুন

নিজেকে যাচাই করতে নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন

১. ভগত সিং কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
ক) ১৯০৫ সালে
খ) ১৯০৭ সালে
গ) ১৯১০ সালে
ঘ) ১৯১২ সালে
উত্তর: খ) ১৯০৭ সালে

২. ১৯১৯ সালের কোন নৃশংস ঘটনা ভগত সিং-এর বৈপ্লবিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?
ক) চৌরিচৌরা কাণ্ড
খ) জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড
গ) রাওলাট অ্যাক্ট
ঘ) বঙ্গভঙ্গ
উত্তর: খ) জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড

৩. ভগত সিং ১৯২৬ সালে কোন যুব সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?
ক) অনুশীলন সমিতি
খ) নওজোয়ান ভারত সভা
গ) গদর পার্টি
ঘ) বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স
উত্তর: খ) নওজোয়ান ভারত সভা

৪. কার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ভগত সিং জন সন্ডার্সকে হত্যা করেছিলেন?
ক) মহাত্মা গান্ধী
খ) বাল গঙ্গাধর তিলক
গ) লালা লাজপত রায়
ঘ) চিত্তরঞ্জন দাশ
উত্তর: গ) লালা লাজপত রায়

৫. ভগত সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত কত সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ করেন?
ক) ১৯২৭ সালে
খ) ১৯২৮ সালে
গ) ১৯২৯ সালে
ঘ) ১৯৩০ সালে
উত্তর: গ) ১৯২৯ সালে (৮ এপ্রিল)

৬. আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের সময় ভগত সিং-এর মূল লক্ষ্য কী ছিল?
ক) ব্রিটিশ ভাইসরয়কে হত্যা করা
খ) আইনসভা ভবন উড়িয়ে দেওয়া
গ) বধির ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করা
ঘ) নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করা
উত্তর: গ) বধির ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করা

৭. ভগত সিং-এর দেওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগানটি কী ছিল?
ক) জয় হিন্দ
খ) বন্দে মাতরম্
গ) ইনকিলাব জিন্দাবাদ
ঘ) দিল্লি চলো
উত্তর: গ) ইনকিলাব জিন্দাবাদ

৮. কারাবন্দি থাকাকালীন ভগত সিং-এর লেখা বিখ্যাত প্রবন্ধটির নাম কী?
ক) ভারত ও বিপ্লব
খ) কেন আমি নাস্তিক (Why I am an Atheist)
গ) স্বাধীনতার পথ
ঘ) আমার জীবন কথা
উত্তর: খ) কেন আমি নাস্তিক

৯. ভগত সিং-এর সাথে আর কোন দুই বিপ্লবীর একই দিনে ফাঁসি হয়েছিল?
ক) রাজগুরু ও সুখদেব
খ) চন্দশেখর আজাদ ও যতিন দাস
গ) ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী
ঘ) সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদার
উত্তর: ক) রাজগুরু ও সুখদেব

১০. ভগত সিং কত বছর বয়সে শহিদ হয়েছিলেন?
ক) ২১ বছর
খ) ২৩ বছর
গ) ২৫ বছর
ঘ) ৩০ বছর
উত্তর: খ) ২৩ বছর


প্রয়োজনীয় কিছু FAQ (সাধারণ জিজ্ঞাসা)

১. ভগত সিং-কে কেন ‘শহিদ-ই-আজম’ বলা হয়?

উত্তর: ‘শহিদ-ই-আজম’ শব্দের অর্থ হলো ‘মহান শহিদ’। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অতুলনীয় সাহস, দেশপ্রেম এবং মাত্র ২৩ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরায় তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে।

২. ভগত সিং কেন আইনসভায় বোমা ফেলার পর পালিয়ে যাননি?

উত্তর: ভগত সিং চেয়েছিলেন তাঁর বিচারের মাধ্যমে বিপ্লবের বাণী সারা ভারতের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে গ্রেপ্তার হওয়াকে বেশি কার্যকর মনে করেছিলেন যাতে আদালতকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

৩. এইচএসআরএ (HSRA) কী?

উত্তর: এর পূর্ণরূপ হলো ‘Hindustan Socialist Republican Association’। ভগত সিং এবং চন্দ্রশেখর আজাদের নেতৃত্বে এই সংগঠনটি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করত।

৪. ভগত সিং-এর রাজনৈতিক আদর্শ কী ছিল?

উত্তর: ভগত সিং কেবল ব্রিটিশদের দেশ থেকে তাড়াতে চাননি, তিনি এমন একটি সমাজ চেয়েছিলেন যেখানে মানুষের ওপর মানুষের কোনো শোষণ থাকবে না। তিনি সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন।

৫. ২৩শে মার্চ দিনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: ১৯৩১ সালের ২৩শে মার্চ লাহোর জেলে ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই তিন বীরের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর ভারতে এই দিনটিকে ‘শহিদ দিবস’ (Martyrs’ Day) হিসেবে পালন করা হয়।

  1. Trial Proceedings of Lahore Conspiracy Case (1930). ↩︎

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top