ভূমিকা:
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারতের ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন। কিন্তু এই মাহেন্দ্রক্ষণের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ১৪ই আগস্টের ইতিহাস ছিল অত্যন্ত জটিল এবং আবেগপ্রবণ। একদিকে ছিল ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসানের উত্তেজনা, আর অন্যদিকে ছিল দেশভাগের এক রক্তাক্ত ক্ষত। আজ আমরা ফিরে দেখব সেই ঐতিহাসিক দিনটি এবং জানব কেন স্বাধীনতার উৎসবে মহাত্মা গান্ধী উপস্থিত ছিলেন না।

১. দেশভাগের পটভূমি এবং রেডক্লিফ লাইনের অভিশাপ
১৯৪৭ সালের শুরু থেকেই অখণ্ড ভারতের মানচিত্র বদলে যাওয়ার সুর বেজে উঠেছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি চেয়েছিলেন শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর, কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি এবং ব্রিটিশদের ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতির ফলে দেশভাগ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
লন্ডন থেকে তলব করা হলো ব্যারিস্টার স্যার সিরিল রেডক্লিফকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে মানুষটি ভারতের সীমানা নির্ধারণ করলেন, তিনি তার আগে কোনোদিন এই দেশে পা রাখেননি। এখানকার ভৌগোলিক অবস্থান বা মানুষের ধর্মীয় আবেগ সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। স্রেফ কলমের এক খোঁচায় তিনি কয়েক কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিলেন, যা ইতিহাসে ‘রেডক্লিফ লাইন’ নামে পরিচিত।
২. কেন স্বাধীনতার উৎসবে দিল্লিতে ছিলেন না মহাত্মা গান্ধী?
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রহরে যখন দিল্লির রাজপথ উৎসবে মেতেছিল, তখন জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী ছিলেন দিল্লি থেকে হাজার মাইল দূরে, কলকাতায়। বাংলা তখন সাম্প্রদায়িক হিংসায় দাউদাউ করে জ্বলছে। সর্দার প্যাটেল এবং জওহরলাল নেহরু তাঁকে দিল্লি আসার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখলেও গান্ধীজি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি তৎকালীন কলকাতা ও নোয়াখালীর দাঙ্গা কবলিত মানুষের পাশে থাকা এবং সম্প্রীতি বজায় রাখাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। ১৫ই আগস্ট তিনি উপবাস থেকে প্রার্থনা করেছিলেন এবং কলকাতার বেলেঘাটায় দাঙ্গা থামানোর জন্য আমরণ অনশনের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। ইতিহাসে এটি ‘কলকাতার মিরাকল’ হিসেবে পরিচিত।
৩. নেহরুর দ্বিধা এবং লাহোরের ট্র্যাজেডি
১৪ই আগস্ট বিকেলে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কাছে লাহোর থেকে একটি ফোন আসে। সেই ফোনে লাহোরে হিন্দু ও শিখদের ওপর চলমান অকথ্য নির্যাতন এবং জলের লাইন কেটে দেওয়ার খবর শুনে নেহরু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি ভেবেছিলেন ১৫ই আগস্টের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ দিতে যাবেন না। কিন্তু জাতীয় নেতৃত্বের চাপে এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশার কথা ভেবে তিনি শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে নেন।
৪. ট্রিস্ট উইথ ডেসটিনি: মধ্যরাতের সেই কালজয়ী ভাষণ
১৪ই আগস্ট রাত ১১টা বেজে ৫৫ মিনিট। দিল্লির সংবিধান সভাঘরে (Constituent Assembly) পিনপতন নিস্তব্ধতা। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। ঠিক সেই মুহূর্তে নেহরু তাঁর অমর ভাষণ শুরু করেন— “At the stroke of the midnight hour, when the world sleeps, India will awake to life and freedom.”
এই ভাষণটি কেবল ভারতের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামের এক অনন্য দলিল হয়ে আছে। ২০০ বছরের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ভারত এক নতুন ভোরের দিকে যাত্রা শুরু করে।
৫. বাংলার চিত্র: দাঙ্গা থেকে ভ্রাতৃত্বের মিলন
কলকাতায় ১৪ই আগস্টের সকাল ছিল আতঙ্কের, কিন্তু বিকেল হতেই পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। গান্ধীজির উপস্থিতিতে হিন্দু ও মুসলিম যুবকরা একসাথে জাতীয় পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে আসেন। স্লোগান ওঠে— “হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই”।
- শহর কলকাতার বড় বড় বাড়িগুলোতে ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে তেরঙা জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়।
- মিষ্টির দোকানে রাতভর কাজ চলে।
- মন্দির, মসজিদ এবং গুরুদ্বার থেকে সাধারণ মানুষের জন্য অন্ন ও শরবত বিতরণ করা হয়।
- শহরের অলিতে গলিতে সানাই আর ড্রামের আওয়াজে স্বাধীনতার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।
৬. দেশভাগের নির্মম বাস্তবতা ও উদ্বাস্তু সমস্যা
স্বাধীনতার আনন্দের সমান্তরালে এক বিশাল মানবিক বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছিল। কয়েক লক্ষ মানুষ তাঁদের ভিটেমাটি হারিয়ে রিক্ত হস্তে সীমানা পার হচ্ছিলেন। এক বিশাল জনসমষ্টি রাতারাতি ‘উদ্বাস্তু’ বা রিফিউজি হয়ে পড়ল। শিয়ালদহ স্টেশন এবং হাওড়া স্টেশন হয়ে উঠল ছিন্নমূল মানুষের কান্নার সাক্ষী। পাঞ্জাব এবং বাংলার সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল, তা আজও ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।
উপসংহার:
১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ই আগস্ট ভারতের ইতিহাসে এক মিশ্র অনুভূতির দিন। এটি ছিল যেমন দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল, তেমনি ছিল বিচ্ছেদের এক করুণ আখ্যান। আজ ৭৮তম স্বাধীনতা দিবসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আমাদের স্মরণ করা উচিত সেইসব বীর শহীদদের এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো মহানায়কদের, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজকের এই মুক্ত বাতাস গ্রহণ করছি।
নিজেকে যাচাই করতে নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন
১. ১৯৪৭ সালের কত তারিখে পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে?
ক) ১২ই আগস্ট
খ) ১৪ই আগস্ট
গ) ১৫ই আগস্ট
ঘ) ২৬শে জানুয়ারি
উত্তর: খ) ১৪ই আগস্ট
২. ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় কে ছিলেন, যিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন?
ক) লর্ড কার্জন
খ) লর্ড ডালহৌসি
গ) লর্ড মাউন্টব্যাটেন
ঘ) লর্ড ওয়াভেল
উত্তর: গ) লর্ড মাউন্টব্যাটেন
৩. ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমানা নির্ধারণের জন্য গঠিত কমিশনের প্রধান কে ছিলেন?
ক) লর্ড মাউন্টব্যাটেন
খ) স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ
গ) স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস
ঘ) মহাত্মা গান্ধী
উত্তর: খ) স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ
৪. ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন’ (Indian Independence Act) কবে পাস হয়েছিল?
ক) জানুয়ারি ১৯৪৭
খ) মার্চ ১৯৪৭
গ) জুন ১৯৪৭
ঘ) জুলাই ১৯৪৭
উত্তর: ঘ) জুলাই ১৯৪৭
৫. পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে কে শপথ গ্রহণ করেন?
ক) লিয়াকত আলী খান
খ) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
গ) একে ফজলুল হক
ঘ) আল্লামা ইকবাল
উত্তর: খ) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
৬. দেশভাগের সময় মূলত কোন দুটি প্রদেশকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছিল?
ক) বিহার ও উড়িষ্যা
খ) বাংলা ও পাঞ্জাব
গ) বোম্বাই ও মাদ্রাজ
ঘ) আসাম ও সিন্ধু
উত্তর: খ) বাংলা ও পাঞ্জাব
৭. কেন পাকিস্তান ১৪ই আগস্ট এবং ভারত ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে?
ক) মাউন্টব্যাটেন যেন উভয় দেশের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন
খ) দুই দেশের সময়ের পার্থক্যের কারণে
গ) জ্যোতিষশাস্ত্রীয় কারণে
ঘ) ব্রিটিশদের বিশেষ অনুরোধে
উত্তর: ক) মাউন্টব্যাটেন যেন উভয় দেশের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন (লজিস্টিক সুবিধার্থে)
৮. সীমানা নির্ধারণকারী রেখাটি কী নামে পরিচিত?
ক) ডুরান্ড লাইন
খ) ম্যাকমোহন লাইন
গ) র্যাডক্লিফ লাইন
ঘ) নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC)
উত্তর: গ) র্যাডক্লিফ লাইন
৯. ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট করাচিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় মাউন্টব্যাটেন কার হাতে ক্ষমতা তুলে দেন?
ক) জওহরলাল নেহরু
খ) মহাত্মা গান্ধী
গ) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
ঘ) রাজেন্দ্র প্রসাদ
উত্তর: গ) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
১০. স্বাধীনতার সময় ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি কে ছিলেন?
ক) জওহরলাল নেহরু
খ) সর্দার প্যাটেল
গ) জে বি কৃপালিনী
ঘ) মৌলানা আজাদ
উত্তর: গ) জে বি কৃপালিনী
প্রয়োজনীয় কিছু FAQ (সাধারণ জিজ্ঞাসা)
১. ১৪ই আগস্ট ১৯৪৭ তারিখটির গুরুত্ব কী?
উত্তর: এই দিনে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মানচিত্রে স্থান পায়। লর্ড মাউন্টব্যাটেন করাচিতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এটি ভারত বিভাজনের চূড়ান্ত পর্যায় ছিল।1
২. ভারত ও পাকিস্তান কেন আলাদা দিনে স্বাধীনতা দিবস পালন করে?
উত্তর: লর্ড মাউন্টব্যাটেন ছিলেন উভয় দেশের শেষ ভাইসরয়। লজিস্টিক কারণে তাঁর পক্ষে একই দিনে করাচি এবং দিল্লিতে উপস্থিত থাকা সম্ভব ছিল না। তাই ১৪ই আগস্ট করাচিতে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠান শেষ করে তিনি ১৫ই আগস্ট দিল্লির অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এই কারণে পাকিস্তান ১৪ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে।
৩. র্যাডক্লিফ লাইন (Radcliffe Line) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণের জন্য ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়। তাঁর নামানুসারে দুই দেশের এই সীমানা রেখাকে ‘র্যাডক্লিফ লাইন’ বলা হয়।
৪. দেশভাগের সময় বাংলা ও পাঞ্জাবের পরিস্থিতি কেমন ছিল?
উত্তর: দেশভাগের ফলে এই দুটি প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ঘরবাড়ি ত্যাগ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার মতো মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। বাংলার একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পাঞ্জাবের একটি অংশ পশ্চিম পাকিস্তানে যুক্ত হয়।
৫. মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা বা ৩রা জুনের পরিকল্পনা কী?
উত্তর: ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাজনের যে পরিকল্পনা পেশ করেন, তাকেই মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা বলা হয়। এই পরিকল্পনার ভিত্তিতেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাস করা হয় এবং দেশভাগের পথ প্রশস্ত হয়।
- Larry Collins and Dominique Lapierre, Freedom at Midnight. ↩︎
